জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বিএনপি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটা শুরু করেছে। গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে দলটি বারবার ভিন্নমত দমন ও সংঘাতমুখী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। তারা জাতির সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা করছে।’ গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছেন, আমি বলেছিলাম বিএনপি আজকে থেকে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই আপনারা হাজার চেষ্টা করলেও ওই আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না; বড়জোর দুর্বল আওয়ামী লীগ হতে পারবেন। যে আওয়ামী লীগ একসময় পুরো জাতিকে নিয়ে কিংবা বিরোধী দলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত, আজ তাদের কী দশা? আপনারা ঠিক একই কাজ শুরু করেছেন।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘দুইটা ভোট হয়েছে। একটা ভোট তাদের (বিএনপি) পক্ষে গেছে, সেটি তারা মেনে নিয়েছে। আরেকটি ভোটে ৭০ শতাংশ জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেটি তারা মানেনি। এটা লজ্জার। ৭০ শতাংশ ভোটের রায় যেদিন বাস্তবায়িত হবে, সেদিন দেশ থেকে সত্যিকার অর্থে ফ্যাসিবাদ বিদায় নেবে।’
বিএনপিকে জুলাই বিপ্লবের ‘সুবিধাভোগী’ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান না হলে, মানুষ জীবন না দিলে বিএনপি আজকে ক্ষমতার তাপ উপভোগ করতে পারত না। যারা বিদেশে ছিলেন, বিপ্লবের কারণে স্বদেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন। এই বিপ্লব না হলে তারা দেশে ফিরে আসার চিন্তা করতে পারতেন না।’
জামায়াত আমির বলেন, থানার ভেতরে ঢুকে দুঃখজনকভাবে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে হামলা করা হয়েছে। গত শুক্রবার নেত্রকোনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার ওপরে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এটা কোন বাংলাদেশ? এই বাংলাদেশ কি আপনারা চেয়েছিলেন?’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে দা-কিরিচ-কুড়াল দেখতে চান না উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা খাতা ও কলম দেখতে চাই। আমরা কোনো আদুভাই, দাদুভাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমাদের সন্তানদের ওপর ছড়ি ঘোরাক আমরা এটা দেখতে চাই না। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ না করেন, মনে রাখবেন জুলাই শুধু ’২৪ সালে ছিল না, জুলাই প্রত্যেক বছরে আছে। সে জুলাই আবার ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ এবং তখন ফাইনালি ফ্যাসিবাদের কবর রচিত হবে।’
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমার জানা নেই, যারা মুরব্বি আছেন তারা বলতে পারবেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে কোনো সরকার এতটা অজনপ্রিয় হয়েছিল কিনা। আমরা জানি না আগামী ছয় মাসে তাদের কি পরিণতি হবে।’
তিনি বলেন, আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমাদের দাবি একটাই গণভোটের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সম্মান দেওয়া, শহীদ পরিবারকে সম্মান দেওয়া। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা এ দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের পথে, পুরনো স্বৈরাচারের পথে এ দেশকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘বিএনপি ফ্যামিলি, কৃষক কার্ড দিয়ে জনগণকে ভোলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এই কার্ড দিতে দিতে তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে, তেল ফুরিয়ে গেছে। অথচ মন্ত্রীরা সংসদে বলছেন কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করছে, অর্থনৈতিক সমস্যাকে অস্বীকার করছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ক্রমান্বয়ে অবনতি হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার করছে।
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মোনাফেকি করে দ্বিচারিতা করে একবার গাং পার হতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে আপনারা জাতির কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন এটা মূলত জনগণের সঙ্গে নতুন করে আরেকটি প্রতারণা এবং ভাঁওতাবাজি। আপনারা জুলাই সনদের স্পিরিট বাস্তবায়ন করতে চান না। আপনাদের নোট অব ডিসেন্টগুলো জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন।’
হাত হারানো আহত জুলাই যোদ্ধা আতিকুল ইসলাম বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায়কে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই রায়কে গলা টিপে হত্যা করতে চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদ, খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান, শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম, শহীদ সৈয়দ মুনতাসীর রহমান আলিফের বাবা গাজিউর রহমান, শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হাসান, শহীদ ফয়সাল আহমদের বাবা জাকির হোসেন, শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন, শহীদ জোবায়ের ওমর খানের বাবা জাহাঙ্গীর আহমেদ খান, জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষে মিকদাদ হোসেন খান আকিবের বাবা দেলোয়ার হোসেন, আহত জুলাই যোদ্ধা রেসালাত বিন নাঈম, জুলাই যোদ্ধা কামরুল হাসান প্রমুখ।
