জাতীয় সংসদে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী। কেন না চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রসমাজ কোটা নয়, মেধার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার, সেটা দমন করতে গিয়ে ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী নামিয়েছিল। কোলের শিশু থেকে শুরু করে দুই সহস্রাধিক শহীদের রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতন হলে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যরা রাতারাতি উপাচার্য হলেন। একেকজন দু-তিনবার প্রমোশন পেলেন। আশ্চর্যের বিষয়, বিগত দুই বছরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাষ্ট্রযন্ত্রের তেমন কোনো নিয়োগ দৃশ্যমান হয়নি, বরং বেকারত্ব বেড়েছে। বিএনপির অঙ্গীকার, এক কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। বর্তমানে সরকারি ও বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেভাবে চলতে থাকলে আধিপত্যই মুখ্য হবে। তখন বেকারদের কর্মসংস্থান অনেকাংশে গৌন হয়ে যাবে। কোনো প্রশাসন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য কখনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। রাষ্ট্র কাঠামোয় গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের হত্যার বিচার, অনেকটা শ্লথ হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত শিক্ষাঙ্গনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।
শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকলে, শিক্ষাঙ্গনে হানাহানি কমে। তখন ইতিবাচক রাজনীতির দ্বার উন্মোচিত হয়। এ কারণে পানিসম্পদমন্ত্রী ডাকসুর সাবেক নেতা, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির প্রস্তাব গুরুত্ববহ। কেননা, আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যা নিরসনের পথ প্রশস্ত হবে। আহমদ ছফা তার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “এ দেশে যারা ছাত্ররাজনীতি করে, তারা জাতীয় রাজনীতির ‘শিশু শ্রমিক’।” কথাটি এ জন্যই এসেছে যে, দেশের রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি হারিয়েছে তার সূচিতা। ছাত্ররাজনীতির কর্মপরিধি এখন শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। ছাত্ররাই ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ার। ক্ষমতাবানরা সেটা সরকারি কিংবা বিরোধী দল হলেও, একই সঙ্গে অন্যরা ছাত্রদের জাতীয় রাজনীতির পাওয়ার শেয়ারিংয়ের বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে সুকৌশলে। কোমলমতি ছাত্ররা ব্যবহার হচ্ছে, দলীয় কূ-রাজনীতির ক্রীড়নক হিসেবে। রাজনীতিবিদরা দেখিয়েছেন, ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হওয়ার শর্টকাট পথ। আর এ পথে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রতিনিয়ত বাহিনী বাড়াতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন, অতিরিক্ত অর্থ। প্রথম কিছুদিন বড় ভাইয়েরা অর্থ দিয়ে উৎসাহিত করে, তারপর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। এ ছাড়া যারা ইয়ার ড্রপ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হতে চান, কাঠঠোকরা পাখির মতো কাঠ খুঁড়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দ্যাখে, অথচ স্বপ্নরা কি তাদের দ্যাখে? একজন মানুষ ইচ্ছে করলেও সারাজীবন ছাত্র থাকা সম্ভব নয়, তেমনি ছাত্রনেতা থাকাও অসম্ভব। অথচ শুধু স্বীকৃতির আশায় কোনো কোনো ছাত্র দুই থেকে তিন দশক অর্থাৎ জীবনের অর্ধেক সময় ব্যয় করছে একই শিক্ষাঙ্গনে। এ আধিপত্যবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দলগুলো এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গদল থেকে সহযোগী দল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে। যেখানে ছাত্র সংগঠনের মূল কর্তৃত্ব, মূল দলের ছদ্মাবরণেই হয়ে থাকে। সেটা অনুমোদিত কিংবা অনুমোদনবিহীন অথবা যেকোনো পর্যায়ের স্বীকৃতির মাধ্যমেই হোক না কেন।
বাস্তবতা হলো, ছাত্রনেতৃত্ব গ্রহণের জন্য এখন সাধারণ ছাত্রের দ্বারস্থ হতে হয় না। দলের কর্তাব্যক্তিদের মোসাহেবী করলে যেখানে নেতৃত্ব আসে এবং নেতৃত্ব থাকে, সেখানে ছাত্ররাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্থাৎ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন কী? সংমিশ্রিত বিবেক এবং সময়ের নির্লজ্জ সংশ্লিষ্টতাকে সঙ্গে নিয়ে, আমরা এগোচ্ছি উন্নত আকাক্সক্ষার দিকে। ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই সময়ের দাবিতে ছাত্র পরিচিত হচ্ছে ছাত্রনেতায়। অতীত থেকে পেলাম বিপ্লব আর শিক্ষা থেকে পেলাম বিপ্লবের ন্যায়ত ব্যবহার। বিপ্লব শেখালো, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর ব্যর্থ প্রয়াস। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের ছাত্রসুলভ মনোভাব, যোগ্যতা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং জবাবদিহিতার স্ফুরণ ঘটাতে পারলেÑ এখনো তাদের উৎপাদনমুখী জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু কে উদ্যোগী হয়ে ছাত্রদের সুপথে পরিচালিত করবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস, সম্পাদকম-লীর সদস্যবর্গ এমনকি সদস্যরাও একাধিকবার মন্ত্রী, এমপি হয়েছেন। যারা ডাকসুতে পরাজিত হয়েছেন, তারাও জাতীয় রাজনীতির স্বাদ পেয়েছেন। অনেকেই হয়েছেন ব্যাংক, বীমা, করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিংবা ডিরেক্টর। অনুরূপভাবে রাকসু, চাকসু, বাকসু, ইউকসুর নেতৃবৃন্দও হয়েছেন। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির অংশীদার হলেই ট্যাক্স ফ্রি দামি গাড়ি, সরকারি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট, লাল পাসপোর্ট, রিম্যুনারেশন সব পাওয়া যায়। হওয়া যায় অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক এবং পাওয়া যায় বিনা পুঁজিতে তদবির বাণিজ্যের লাইসেন্স। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে বছরের পর বছর দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলো না, তার বেনিফিশিয়ারি কারা? প্রথমত, যারা অতীতে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় ছিল তারা। দ্বিতীয়ত, সিভিল ব্যুরোক্র্যাট, টেকনোক্র্যাট, ব্ল্যাক মানিহোল্ডার, রিটায়ার্ড আমলা, বিজনেস ম্যান যারা কিনা ক্ষমতার অংশীদার। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসন। প্রতি বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নামে ভর্তির সময় ছাত্রদের কাছে যে ফি আদায় হয়, তা লুটপাট করে বিশ্ববিদ্যালয়-হল-কলেজ প্রশাসন। এরাই ক্ষমতার ছদ্মাবরণে তহবিল লুট করছে। রাষ্ট্র কাঠামো যেখানে সেকেন্ডারি লিডারশিপ প্রমোট করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। অথচ সব পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে ভাগবাটোয়ারাতন্ত্র বহালতবিয়তে চলছে। পরিবর্তন হয়েছে শুধু সাইন বোর্ডের। আসলে আমাদের পূর্বপুরুষরা সব অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন, অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুখী, সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে পড়াশোনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ছাত্রনেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে শাপমোচন করার মানসিকতা ধারণ করতেন।
আমরা ইতিহাসের উচ্ছিষ্ট হিসেবে ক্রমে অবহেলা, প্রবঞ্চনা, ধিক্কার ও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে দুঃসময় অতিক্রম করছি। ফলশ্রুতিতে কলুষিত হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় অতীত। বিবেকবান, কোমলমতি, নিষ্ঠাবান, মেধাবী ছাত্ররা মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে পাশর্^বর্তী দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মেধা পাচারের মাধ্যমে খুঁজে দায়সারা গোছের নিজস্ব ঠিকানা। সমুচিত জবাব বা লেখনীর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে মেধাবী তরুণ-তরুণী। বর্তমানে অনেক রাজনীতিবিদ অডিটরিয়াম ভাড়া করে, ছাত্রদের নেতৃত্বের লোভ দেখিয়ে শ্রোতার আসনে বসিয়ে ‘ন্যাশনাল কভারেজ’ নিচ্ছে। আর এরাই নিজের সন্তানকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়িয়ে, হাইব্রিড কিংবা বিদেশমুখী করছে। অথচ অবলীলায় পরের সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন লাঠি। এ যেন অক্ষমদের ‘চলিতেছে সার্কাস’ অথবা ‘যাত্রাপালার’ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। সমাজ ও রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এ এক ভয়ংকর আয়োজন! আসলে শিক্ষাকে অর্জন করা ছাড়া, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন। হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে কুদরত-ই-খুদা (১৯৭৪) শিক্ষা কমিশন, সর্বাবস্থায়ই চলছে, কীভাবে ছাত্রকে বিবেক বিবেচনাবোধে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তৈরি করা যায়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ইউনেস্কোর ভাষায়, Are young people who have successfully completed regular studies at a more or less high level but find their training ill adapted to the economic needs, adults employed in jobs, for which they have not been trained and Professional people whose training no longer meets he requirements of technical progress. সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতি তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে চলছে পরিবর্তনের পালা। একমাত্র প্রকৃত শিক্ষাই, সমাজ ও রাষ্ট্রের বাঞ্ছনীয় পরিবর্তন আনতে পারে। ‘ছাত্ররাজনীতি’ যদি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক হয় এবং সংগঠনে নিয়মিত ছাত্রের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তাদের যা খুশি তা করার সুযোগ নেই। মূলত দুটো জায়গায় দায়বদ্ধতা থাকবে তাদের। এক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দুই, নিজ সংগঠনে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ছাত্র যদি অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কেউ অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হলে মূল সংগঠন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া রাষ্ট্রের আইনকানুন তো রয়েছেই। সমস্যা হলো, আইন-বিচার-প্রশাসন সর্বত্র পয়েন্টে পয়েন্টে মাই ম্যান প্রতিষ্ঠা করার ফলে, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য আজ অনেকেই চায় না, ছাত্ররাজনীতি পরিচ্ছন্ন হোক। তারা ছাত্রসমাজকে ‘দাবার ঘুটি’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তবে এর বাইরেও মুক্ত ও গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে এবং অছাত্র, বহিরাগত, প্রৌঢ়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, গ্রুপিংবাজদের কবল থেকে নেতৃত্ব উদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে মেধাবী ও নিয়মিত ছাত্রদের হাতে নেতৃত্বের নিয়নকাঠি তুলে দিয়ে স্পষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। নেতৃত্বের কণ্ঠে যেন সেই ধ্বনি প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়, যা ছিল আমাদের অতীত গৌরব। ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ তার ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘চক্ষুষ্মান প্রাণীরা যখন দীর্ঘকাল গুহাবাসী হইয়া থাকে, তখন তাহারা দৃষ্টিশক্তি হারায়। আলোক থাকিবে না অথচ দৃষ্টি থাকিবে, প্রকৃতি এই অসঙ্গতি সহিতে পারে না।’
লেখকঃ সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল