কাউকে চেনার জন্য চল্লিশ বছর অনেক লম্বা সময়। এতটাই লম্বা যে, সময় গোনা বন্ধ করে দেওয়া যায়। আমাদের দেখা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। হংকং-এ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড কমনওয়েলথ ফটোগ্রাফির জন্য চারজনের একটি জুরিতে। তিনি ছিলেন রঘু রাই শুধু নামটারই একটা গুরুত্ব ছিল, একটা ইতিহাস ছিল। আমি ছিলাম বাংলাদেশের প্রায় অপরিচিত একজন ফটোগ্রাফার। সেটা তার কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না। আর এটাই মানুষটা সম্পর্কে আমার যা কিছু জানার দরকার ছিল, তার সবই বলে দিয়েছিল।
বিচার পর্ব শেষ হলে আমরা দুজন গুয়াংঝৌ-এর ট্রেনে উঠলাম। আমরা যেন আবিষ্ট হয়ে ছবি তুলছিলাম। আলো, রাস্তা, মুখগুলো আমরা এসবের জন্য ক্ষুধার্ত ছিলাম। এরপর বহু বছর ধরে তিনি আমাকে ঠাট্টা করতেন, ঠিক যেমনটা একজন পুরনো বন্ধুই করতে পারে। আমার সেই কাজগুলো রিচমন্ডের নিকন গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছিল। অথচ একই দিনে তোলা তার ছবিগুলো দিল্লির কোনো এক আলমারিতে চুপচাপ পড়ে ছিল। তিনি আলমারিগুলোকে কখনোই পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারেননি।
রঘু এবং সেবাস্তিয়াও সালগাদো আমার ‘মাই জার্নি অ্যাজ এ উইটনেস’ বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন। আমি লিখেছিলাম তার ‘বাংলাদেশ : দ্য প্রাইস অফ ফ্রিডম’ বইটির ভূমিকা। পরিবারের জন্য যেভাবে হাজির হতে হয়, আমরাও একে অন্যের কাজে সেভাবেই হাজির হতাম, না চাইতেই। তিনি ছবি মেলায় আসতেন। পাঠশালার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। আমি তার বানানো স্কুলে যেতাম আর তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। আমরা একে অন্যের জগতের মধ্যে দিয়ে চলতাম।
তিনি আমার রাজনীতিকে কখনোই সমর্থন করতেন না। তার মনে হতো, এটা আমার শিল্পের কাঠামোকে জট পাকিয়ে দেয়। পুরনো বন্ধুদের মতো আমরা এ নিয়ে তর্ক করতাম ঘর্ষণের আড়ালে থাকত স্নেহ। তবুও যখন শেখ হাসিনার শাসন আমাকে কেড়ে নিল, যখন আমাকে অপহরণ করা হলো, নির্যাতন করা হলো, জেলে পুরে দেওয়া হলো, তখন রঘুই প্রথম লিখেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠি। কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমার জন্য নিজের নাম, নিজের মর্যাদা বাজি রেখেছিলেন। আমার রাজনীতি নিয়ে তার যাই ধারণা থাকুক না কেন, তিনি জানতেন ন্যায়বিচার কী।
মোদির সমালোচনা করার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে আমি ভারতে অবাঞ্ছিত। তাই যখন ক্যানসার ধরা পড়ল, আমি তার কাছে যেতে পারিনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, তিনি এটা কাটিয়ে উঠবেন। তিনি হার্ট সার্জারি থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন এবং পরে আমাকে ফোন করে হাসতে হাসতে বলেছিলেন যে তার নিজেকে কুড়ি বছরের তরুণ মনে হচ্ছে। আমি তার কথা বিশ^াস করেছিলাম। আমি সব সময় তাকে বিশ্বাস করতাম।
আজ সকালে ইনা পুরীর বার্তা এলো। গুজবগুলো সত্যি ছিল।
রঘু আর নেই।
আমরা আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা একজন আলোকচিত্রীকে হারালাম। এমন একজনকে, যিনি বুঝতেন যে ক্যামেরা শুধু সৌন্দর্যের যন্ত্র নয়, বরং সাক্ষ্য বহনেরও যন্ত্র। আমি এমন কিছু হারিয়েছি যার নাম দেওয়া আরও কঠিন এমন একজন বন্ধু, যে আমাকে চার দশক ধরে চিনতেন, সীমান্ত পেরিয়ে, তর্ক-বিতর্ক পেরিয়ে, এমনকি জেলের প্রকোষ্ঠ থেকেও।
বিদায়, বন্ধু ...।
আলো তোমার সঙ্গে থাকুক।
লেখক : আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী। দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। ইংরেজি থেকে অনুবাদ : সাহাদাত পারভেজ