অসীমে রঘু রাই

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

রঘু রাই ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালে যেসব বিদেশি আলোকচিত্রী বাংলাদেশের পক্ষে বিশ^ জনমত গড়ে তোলেন রঘু ছিলেন তাদের অন্যতম। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান-এর প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে ভারতের শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট তিনি তার মায়াবী ক্যামেরায় তুলে ধরেন। গতকাল রবিবার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান আলোকচিত্র জগতের এই কিংবদন্তি। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। গতকাল সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির লোধি রোড শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মৃত্যুর আগে তিনি নয়াদিল্লিতে বসবাস করতেন। এ সময় তিনি তার ৫৭তম বই নিয়ে কাজ করছিলেন। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে আলোকচিত্র অঙ্গনে একটি যুগের অবসান হলো।

১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের অধুনা পাকিস্তানের জং নামের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রঘু। বাবা মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। তার বাবার আগ্রহ ছিলছোট ছেলে প্রকৌশলী হবে। বাবার ইচ্ছায় পড়লেন পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে। দিল্লিতে একটা সরকারি চাকরিও নিলেন। কিন্তু প্রকৌশল পেশায় তার আর মন বসল না। তার বড় ভাই শরমপাল চৌধুরী (এস পাল) তখন আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। রঘু তার মনের ভেতরের কথা বড় ভাইকে জানালেন। ছোট ভাইয়ের এমন আগ্রহ দেখে শরমপাল রঘুকে তার এক বন্ধুর কাছে পাঠান। ১৯৬২ সালে বড় ভাইয়ের সেই বন্ধুর কাজ দেখতে গ্রামে গেলেন রঘু। এভাবেই ২৩ বছর বয়সে ফটোগ্রাফি তার জীবন ও রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

রঘু রাই ফটোগ্রাফি দুনিয়ার এক মহিরুহ নাম। তাকে ‘ফাদার অব ইন্ডিয়ান ফটোগ্রাফি’ অভিধায় অভিহিত করা হয়। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্রী। এরপর দায়িত্ব পালন করেন কলকাতার সাপ্তাহিক সানডে ম্যাগাজিনের আলোকচিত্র সম্পাদক হিসেবে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিউজ ম্যাগাজিন ইন্ডিয়া টুডে-এর আলোকচিত্র সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। বিশে^র সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফি অ্যাজেন্সি ‘ম্যাগনাম ফটোজ’-এর সদস্যও ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সে সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া লাখো বাংলাদেশি শরণার্থীর চরম মানবিক সংকটের দৃশ্য তার ক্যামেরায় মূর্ত হয়ে ওঠে। তার তোলা ছবি ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত সেই সময় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নাড়া দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের নিয়ে অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত করে। ১৯৮৪ সালে ভোপালের গ্যাস ট্র্যাজেডিতে তার তোলা ছবিগুলো ছিল মানবিক সংবেদনশীলতার জীবন্ত দলিল।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা, মাদার তেরেসা, সত্যজিৎ রায়ের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবন তার ক্যামেরাতেই দারুণভাবে মূর্ত হয়েছিল। তিনি আগ্রার তাজমহল নিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। তার তোলা ছবি টাইম, লাইফ, জিও, লে ফিগারো, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক, দ্য নিউইয়ার্কার, ভোগের মতো বিশে^র শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ‘আলোকচিত্রীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামে তার একটি স্মৃতিচারণ ছাপা হয় প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী অন্যআলোর অনলাইন সংস্করণে। সেখানে রঘু রাই মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। কাজ করেন স্টেটসম্যান পত্রিকায়। ওই সময় তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। কলকাতা থেকে সম্পাদক তাকে ফোন করে বললেন, বাংলাদেশের হাজারো শরণার্থী ভারতে আসছে। তাদের ছবি তোলার জন্য কলকাতায় আসতে হবে। সম্পাদকের কথায় রঘু কলকাতায় এলেন। বিমানবন্দরে নেমে সোজা চলে গেলেন যশোর-খুলনা রোডের দিকে। তখন ভরা বর্ষা। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সীমান্তের পথ ধরে হাজার হাজার মানুষ আসছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধা-সবাই আসছেন হেঁটে। সাইকেলে চড়ে কিংবা গরুর গাড়িতেও আসছেন কেউ কেউ। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এ যেন এক মৃত্যুর নীরবতা।

এই করুণ দৃশ্যটা তাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। তার যখন চার বছর, তখন তিনিও পাকিস্তানের জং গ্রাম থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পরিবারের সঙ্গে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তিনিও একাত্ম হয়ে গেলেন। এরপর সীমান্তের একেবারে কাছে গেলেন। একই দৃশ্য। অন্তহীন পথে মানুষ আসছে। পরদিন গেলেন আরেকটা এলাকায়। কোথাও খালি জায়গা নেই। যে যেখানে পারছে আশ্রয় নিয়েছে। স্কুলসহ নানা জায়গায় উদ্বাস্তুরা ঠাঁই গেড়ে নিয়েছে। যারা কোথাও জায়গা পায়নি তারা আশ্রয় নিয়েছে বড় সিমেন্টের পাইপের মধ্যে। শিশুরা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছে। ক্ষুধার্ত শিশুরা বাস্তবতা বোঝে না। তাদের কান্নায় আকাশ বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির মধেই রান্না হচ্ছে। রঘু একটি শিশুর ছবি তুললেন। ওর চোখভরা পানি, কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না। এ এক কঠিন মুহূর্ত। এক বৃদ্ধাকে দেখলেন ক্লান্ত ও অবসন্ন। রঘু বৃদ্ধার পাশে গিয়ে বসলেন। ব্যথাতুর চোখে বৃদ্ধাটি মাথা তুলে তাকালেন। তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করল। এরপর রঘু চলে গেলেন ত্রিপুরায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় যেতে লাগলেন। ছবি তুলতে থাকলেন শরণার্থীদের। শরণার্থীদের ছবি তোলা ছিল রঘুর জীবনের এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা।

এরপর দিল্লি থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে রঘু এলেন একটি সেনাশিবিরে। সেনাশিবিরটি খুলনা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রঘুর সঙ্গে একজন ক্যাপ্টেনকে যুক্ত করে দেওয়া হলো। রঘু যাত্রা শুরু করলেন একটি ট্যাংক আর শখানেক সৈন্যের কাফেলায়। ট্যাংকটি যাচ্ছে খুলনার দিকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন পিছু হটতে শুরু করেছে। রঘু ট্যাংক ও জওয়ানদের সঙ্গে হাঁটছিলেন। হঠাৎ এয়ার বার্স্ট শুরু হলো। প্রথম শেলটি পড়ল তাদের থেকে ১০০ মিটার দূরে। দ্বিতীয়টি ৫০ মিটার আর তৃতীয়টি পড়ল মাত্র ২০ মিটার দূরে। ক্যাপ্টেন তখন রঘুকে বললেন, ‘আপনি কি কোনো ছবি পাচ্ছেন?’ রঘু বললেন ‘না’। ক্যাপ্টেন বললেন, ‘পরের আক্রমণটা আমাদের দিকে লক্ষ্য করে হতে পারে।’

সেনাবাহিনী এগিয়ে চলেছে ঢাকার দিকে। যুদ্ধ তখনো চলছে। কোথাও কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার পাশে চা ও খাবারের দোকান। কিন্তু মানুষ নেই। পাকিস্তানিদের আক্রমণে বিপন্ন যশোর। সেখানে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘরবাড়ি। অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে ছিল রাস্তায়। রঘু সেসব মরদেহের ছবি তুললেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণপত্রে স্বাক্ষর হলো। বাঙালির বিজয়ের সেই ক্ষণের সাক্ষী রঘু রাই ও ক্যামেরা। আত্মসমর্পণের পর ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন রঘু। মুক্ত বাংলাদেশে তিনি তোলেন বিজয়োল্লাসের ছবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত