কাবার সৌভাগ্যবান অতিথি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৩ এএম

গত শুক্রবার মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় শায়খ ড. আবদুর রহমান আস-সুদাইস মুসল্লিদের তাকওয়া অবলম্বনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, গোপনে ও প্রকাশ্যে মহান আল্লাহকে ভয় করা দুনিয়া ও আখেরাতের সফল হওয়ার মাধ্যম। হজ মৌসুমের ফজিলত বর্ণনা করে তিনি কাবার সৌভাগ্যবান অতিথিদের স্বাগত জানান এবং মক্কার মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি তাওহিদ প্রতিষ্ঠা, শিরক ও বেদয়াত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। হজের বিধান যথাযথভাবে পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকা, ঐক্য বজায় রাখা এবং পবিত্র স্থানের সম্মান রক্ষার তাগিদ দেন।

শায়খ বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা সর্বদা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। যেন আপনারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার অনুগ্রহে প্রতিদান পান এবং জান্নাতে চিরস্থায়ী আবাস লাভ করেন। নিশ্চিতভাবে এতে সব কল্যাণ নিহিত। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা সেই দিনের ভয় করো, যেদিন তোমাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে সে যা উপার্জন করেছে, তা পুরোপুরি দেওয়া হবে। আর তাদের জুলুম করা হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৮১)

হে মুমিনরা! এই যে পবিত্র মাসসমূহ এসে গেছে এবং এই যে হজের উজ্জ্বল মাসসমূহ, এগুলো উম্মাহর আকাশে আলো ছড়িয়েছে, তাদের রাতগুলো দীপ্ত হয়েছে, দিনগুলো উজ্জ্বল হয়েছে। সুসংবাদের ফুলে সুগন্ধ ছড়িয়েছে, কল্যাণ ও বরকতের ফল ফলে উঠেছে। হজযাত্রীদের হৃদয়ে এর ফজিলত ও প্রভাব স্থান করে নিয়েছে। আর দেখুন, মহান আল্লাহর ঘরে মেহমানদের কাফেলার আগমন শুরু হয়েছে। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দূরবর্তী পথ অতিক্রম করে আসছে। তাদের বাহনগুলো এই পবিত্র ভূমি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রান্তরের দিকে ধাবিত হয়েছে।

স্বাগতম সব আগত দলকে, স্বাগতম সব তাওয়াফকারীকে, স্বাগতম ইহরামধারীদের! স্বাগতম ভ্রাতৃত্বের এই সূর্যালোকে, পবিত্রতার এই নির্মল আবরণে। আপনাদের স্বাগতম, হে পরম করুণাময়ের অতিথিরা, এই পবিত্রতম ভূমিতে, সর্বাধিক পবিত্র প্রান্তরে!

এটাই মক্কা মুকাররামা, ধর্ম ও ইসলামের সূতিকাগার, নবী-রাসুলদের আবির্ভাবস্থল, যুগে যুগে সম্মান ও মর্যাদার কেন্দ্র। মহান আল্লাহ এটিকে মনোনীত করেছেন, এর প্রান্তরে কোরআন নাজিল হয়েছে। এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, বেড়ে উঠেছেন এবং প্রেরিত হয়েছেন সৃষ্টির সেরা মানুষ, তার ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক। যত দেশই সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হোক, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মুক্তাটি স্থাপিত হয়েছে উম্মুল কুরায় (মক্কা)। কবিতার পঙ্ক্তিগুলো এর দিকে ধাবিত হয়, আর হজযাত্রীরা কাবার দিকে ছুটে আসেন, এ ধারাবাহিকতা কখনো থামে না।

হে মুসলমানরা! মহান আল্লাহ এই বরকতময় দেশ সৌদি আরবকে অসংখ্য মহৎ বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, এখানে মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর স্থাপিত হয়েছে। এটি তাওহিদ, ঐক্য, ইবাদত, নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতীক। মহান আল্লাহ এই পবিত্র ঘরকে বরকতময় ও সমগ্র বিশ্বের জন্য হেদায়াত বানিয়েছেন।

মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের একটি দিক হলো, যে ব্যক্তি তার এই পবিত্র ঘরে আসে, তার জন্য এখানে নামাজের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, নেকির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ মহান, কী অসীম অনুগ্রহ ও মহান দান, যা তিনি এই পবিত্র ঘর এবং এর আগন্তুকদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।

হে মুসলমানরা! হে সম্মানিত হজযাত্রীরা! সর্বদা এই স্থানের মর্যাদা, সম্মান ও পবিত্রতার বিষয়টি স্মরণ রাখবেন। কাবাঘর বরকত ও হেদায়েতের একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সেই দোয়া, যা তিনি আল্লাহর কাছে করেছিলেন, যেন মক্কা হয় নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও তাওহিদের কেন্দ্র। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার রব, এই শহরকে নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখো।’ (সুরা ইবরাহিম ৩৫) অতএব, বিশুদ্ধ তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের শিরক, সন্দেহ ও বিদয়াত থেকে তা পবিত্র রাখা এই নিরাপদ নগরীতে আগত প্রত্যেকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

বরকতময় দেশ সৌদি আরব, দুই পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক, নিরাপত্তা ও শান্তির দুর্গ, তাওহিদ ও ইমানের কেন্দ্র। এর নিরাপত্তা রক্ষা করা ইবাদত, যা বান্দারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য পালন করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না, আমি এ স্থানকে নিরাপদ করেছি, অথচ তাদের চারপাশে মানুষ অপহৃত হচ্ছে?’ (সুরা আনকাবুত ৬৭) আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ হারাম (পবিত্র ও নিরাপদ স্থান) প্রতিষ্ঠা করিনি, যেখানে সবকিছুর ফলসমূহ একত্র করা হয়?’ (সুরা কাসাস ৫৭)

এখানে এসে উদ্বিগ্ন ব্যক্তি শান্তি পায়, ভীত ব্যক্তি নিরাপত্তা লাভ করে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘এই শহরকে মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ কর্র্তৃক সম্মানিত করার কারণেই কেয়ামত পর্যন্ত এ শহর থাকবে সম্মানিত হিসেবে।’ (সহিহ বুখারি)

এই দৃঢ় নিরাপত্তা শুধু ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং কঠোর সতর্কবাণীর মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে কেউ এর নিরাপত্তা ভঙ্গ করতে চায়, তার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে এতে অন্যায়ভাবে বক্রপথ অবলম্বন করতে চায়, আমি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব।’ (সুরা হজ ২৫)

হে মুসলমানরা! হে আল্লাহর ঘরের হাজিরা! হজ একটি মহান ইবাদত। এর শর্ত, রুকন ও ওয়াজিব রয়েছে, যা জানা ও পালন করা অপরিহার্য, যাতে হজ কবুল হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর জন্য হজ করে এবং অশ্লীলতা ও পাপ থেকে বিরত থাকে, সে তার মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়ার দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।’ (সহিহ বুখারি)

হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বিশুদ্ধ তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ইবরাহিমকে (পবিত্র) ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এ বলে, আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সুরা হজ ২৬)

হে মুসলিম উম্মাহ! আপনাদের উচিত বিভ্রান্তিকর গণমাধ্যম ও ফেতনাবাজদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকা। এ জন্য প্রয়োজন সতর্কতা, যাচাই-বাছাই, প্রজ্ঞা, ঐক্য ও সংহতি। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩) হাজি ও জিয়ারতকারীদের উচিত, এই পবিত্র স্থানের মর্যাদা অনুভব করা। এখানে রক্তপাত করা যায় না, গাছ কাটা যায় না, ভয় দেখানো যায় না, হারানো বস্তু তোলা যায় না, শুধু পরিচয় দেওয়ার জন্য ছাড়া। তাহলে এখানে মানুষকে কষ্ট দেওয়া কীভাবে বৈধ হতে পারে? ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, তা তার অন্তরের তাকওয়ার লক্ষণ।’ (সুরা হজ ৩২)

হে আল্লাহ! আপনার এই ঘরের মর্যাদা, সম্মান ও মহিমা বৃদ্ধি করুন এবং যারা হজ ও ওমরাহ করে, তাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি করুন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম স্থাপিত ঘরটি হলো মক্কায়, যা বরকতময় এবং বিশ্বজগতের জন্য হেদাযয়েতস্বরূপ। এতে স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে (যেমন) মাকামে ইবরাহিম। যে এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। আর মানুষের ওপর আল্লাহর হক হলো, যে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তার জন্য হজ করা কর্তব্য।’ (সুরা আলে ইমরান ৯৬-৯৭)

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন, তাহলে আপনাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই সংশোধিত হবে। জেনে রাখুন, সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথনির্দেশ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ। নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের ক্ষেত্রে নবসৃষ্ট বিষয়সমূহ (বিদয়াত), আর প্রতিটি বিদয়াত ভ্রষ্টতা।

হে আল্লাহর ঘরের হাজিরা! আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, তিনি আপনাদের এই পবিত্র স্থানে আসার তওফিক দিয়েছেন, এই সম্মানিত স্থান ও সময়ে অবস্থানের সুযোগ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লওহে মাহফুজ) মাসগুলোর সংখ্যা হল বারো, এর মধ্যে চারটি সম্মানিত।’ (সুরা তওবা ৩৬) অতএব, এই মাসগুলোর মর্যাদা বুঝুন, এই স্থানের সম্মান রক্ষা করুন। উত্তম চরিত্র ধারণ করুন। দুর্বল ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করুন। পথহারা মানুষকে নম্রভাবে পথ দেখান। শান্তি, ধৈর্য, দয়া ও সহানুভূতি পথ অবলম্বন করুন।

হে আল্লাহ! আপনি হাজিদের নিরাপদ রাখুন, তাদের হজ কবুল করুন, তাদের জন্য সহজ করুন এবং তাদের জন্য মহান প্রতিদান লিখে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন, তার পরিবার ও সকল সাহাবির ওপরও। হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের শক্তিশালী করুন। হজযাত্রী, ওমরাহযাত্রী ও জিয়ারতকারীদের নিরাপদ রাখুন। এই দেশকে এবং সকল মুসলিম দেশকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ রাখুন।

হে আল্লাহ! দুর্বল মুসলমানদের সাহায্য করুন, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের। মসজিদে আকসাকে রক্ষা করুন, তা যেন কেয়ামত পর্যন্ত সম্মানিত থাকে। হে আল্লাহ! আপনার শত্রুদের ধ্বংস করুন, যারা মুসলমানদের শত্রু। তাদের দল ভেঙে দিন, তাদের শক্তি ছিন্নভিন্ন করে দিন।

হে আমাদের রব, আমাদের দোয়া কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আমাদের তওবা কবুল করুন। আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা এবং সব মুসলমান পুরুষ ও নারীর গুনাহ মাফ করুন।

২৪ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত