বাকস্বাধীনতা ও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৪ এএম

মানুষ অনুভূতি, মতামত ও উপলব্ধিকে শব্দ ও ভাষার মাধ্যমে অন্যের সামনে প্রকাশ করে। এই প্রকাশের স্বাধীনতাই সভ্যতার বিকাশকে গতিশীল করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস জুগিয়েছে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সেখানে জুলুম বেড়েছে, মানবিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে বাকস্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা বা উচ্ছৃঙ্খলা নয়। এটি এমন এক অধিকার, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্ব, নৈতিকতা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। ইসলাম এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা দেয়। এখানে মানুষের কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি সেই কথার জবাবদিহির কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্য বলা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ইসলামে ইবাদতের মর্যাদা লাভ করেছে।

বাকস্বাধীনতা না থাকলে সমাজে জুলুমের প্রসার হয়। মানুষের অধিকার খর্ব হয়। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। তাই ন্যায় ও মানবতার ধর্ম ইসলামে বাকস্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যখন পৃথিবীতে বাকস্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না, রাজা-বাদশাহ আর গোত্রপতিদের কথাই ছিল চূড়ান্ত, তখন আপত্তি বা ভিন্নমত জানানোর সাহস কারও ছিল না। এমন সময় পৃথিবীতে আগমন ঘটে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। তিনি মানুষকে আলোর পথ দেখান, সভ্যতার শিক্ষা দেন এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহজাব ৭০) এখানে সঠিক কথার অর্থ হলো, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে বলা হয় এবং তাতে কোনো কপটতার আশ্রয় নেওয়া হয় না।

ইসলাম মানুষকে মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার দিয়েছে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালেম বাদশাহের সম্মুখে সত্য কথা উচ্চারণ করা।’ (জামে তিরমিজি) নবীজি (সা.) মানুষের মতামতকে সম্মান করতেন। ধৈর্য সহকারে তাদের কথা শুনতেন। গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। নবীজি (সা.)-এর ভাষ্য ও জীবনীতে বাকস্বাধীনতার অসংখ্য নজির রয়েছে।

ষষ্ঠ হিজরিতে নবীজি (সা.) মক্কার কাফেরদের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। এই চুক্তির কিছু ধারা বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের জন্য অবমাননাকর ছিল। তাই সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে তা মেনে নেওয়া কষ্টকর হচ্ছিল। তখন সবার পক্ষ থেকে ওমর (রা.) নবীজির দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি হকের ওপর নই? আর তারা কি বাতেল নয়? নবীজি (সা.) বললেন, অবশ্যই। ওমর (রা.) বললেন, আমাদের মৃতরা কি জান্নাতে আর তাদের মৃতরা কি জাহান্নামে যাবে না? নবীজি বললেন, অবশ্যই। তখন ওমর (রা.) বলেন, তাহলে কেন আমরা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দেব? অথচ আল্লাহ এখনো আমাদের এবং তাদের মাঝে কোনো ফায়সালা করেননি। তখন নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহর রাসুল আর আল্লাহ আমাকে কখনো ধ্বংস করবেন না।’ (সহিহ বুখারি)

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ ছিল বাকস্বাধীনতার স্বর্ণযুগ। হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা হিসেবে তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করি, ততক্ষণ আপনারা আমার আনুগত্য করবেন। আর যদি আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যতা করি, তাহলে আপনারা আমার আনুগত্য করতে বাধ্য নন।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৬/৩০৫)

দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) তার বিখ্যাত ভাষণে বলেছিলেন ‘রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তোমরা আমার অংশীদার। তোমাদের উত্তম পরামর্শ দ্বারা আমাকে সাহায্য করো। আমি যদি আল্লাহ ও রাসুলের পথে চলি, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো। আর যদি বিপথগামী হই, আমাকে সংশোধন করো। তোমাদের পরামর্শ ও মতামত দ্বারা আমাকে শক্তিশালী করো।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত