মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে তিন ধাপের প্রস্তাব ইরানের

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে তিন ধাপের একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। সংঘাত বন্ধে শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তার মধ্যে গত রবিবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তেহরানের শর্তগুলো জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের রাজধানীতে এটি ছিল তার দ্বিতীয় সফর। যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া নতুন এই প্রস্তাবে মূলত হরমুজ প্রণালি ও ওয়াশিংটনের নৌ-অবরোধ সংকট সমাধানের ওপর আগে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে এ তথ্য জানিয়েছে। ইরানের প্রস্তাবনা ॥অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং ইরান ও লেবাননের ওপর নতুন করে হামলা বন্ধে নিশ্চয়তা প্রদান। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হওয়ার পরেই আলোচনা দ্বিতীয় পর্যায়ে যাবে, যা হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ওপর আলোকপাত করবে। তৃতীয় পর্যায়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে, যদিও তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোতে অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তারা পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেবে না। ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আরাগচি ওয়াশিংটনকে লিখিত বার্তাও দিয়েছেন, যেখানে তেহরানের অলঙ্ঘনীয় সীমা তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির বিষয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বার্তাটির উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করা, কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়।

আরাঘচি গতকাল সোমবার ইসলামাবাদ থেকে মস্কো যান। সেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সেন্ট পিটার্সবার্গে ওই বৈঠকে পুতিন বলেন, ইরানসহ ওই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর স্বার্থে রাশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ইরানের জনগণ বর্তমানের এই ‘কঠিন সময়’ কাটিয়ে উঠবে এবং সেখানে শান্তি ফিরে আসবে। পুতিন জানান, তিনি মোজতবা খামেনির কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন। রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করে আরাগচি বলেন, এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। রাশিয়ার সমর্থনের জন্য পুতিন ও মস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরাগচি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ইরানের জনগণ যে সাহস দেখিয়েছে, তাতে তারা এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো।

এর আগে, সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামাবাদের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। আরাগচি জানান, ইসলামাবাদে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিবেশ ও শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে মাত্রাতিরিক্ত কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ায় সেই আলোচনা সফল হতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে রুশ মিত্রদের সঙ্গে বিশেষ পরামর্শ করতেই তার এই মস্কো সফর।

এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ক্ষেত্রে তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘কার্ড’ আছে। নিজের এক্সে দেওয়া পোস্টে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অর্থনৈতিক ‘কার্ড’ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ইরানের রয়েছে সরবরাহভিত্তিক সক্ষমতা হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও তেলের পাইপলাইন। সমীকরণের অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদাভিত্তিক পদক্ষেপ কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য মূল্য সমন্বয়। গালিবাফ বলেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তার বেশ কিছু হাতিয়ার ব্যবহার করেছে বা আংশিকভাবে প্রয়োগ করেছে।

তেহরানের কার্ড প্রসঙ্গে ইরানের স্পিকার বলেন, হরমুজ প্রণালি কার্ড আংশিক ব্যবহার হয়েছে। বাব এল-মান্দেব কার্ড ব্যবহার হয়নি; পাইপলাইন কার্ডও ব্যবহার করা হয়নি। ওয়াশিংটনের কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মজুদ থেকে তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে। চাহিদা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আংশিক ব্যবহৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও মূল্য সমন্বয় আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার’ দিকটি তুলে ধরে গালিবাফ আরও বলেন, গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে দেশটিতে জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইরানের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালালে ওয়াশিংটনের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে চার গুণ ক্ষতি নিশ্চিত করা হবে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাঈল সাগাব এসফাহানি এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এক্স বার্তায় তিনি বলেন, আমরা ভিন্ন ধারার অঙ্ক চর্চা করি। এই অঙ্কে ইরানের এক কূপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের চারটি কূপের সমান।

লেবাননে হামলা চলছেই : যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গতকাল সোমবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। হামলায় নিহতদের মধ্যে দুই নারী ও দুই শিশু রয়েছেন; হামলায় আরও ৩৭ জন আহত হয়েছেন। এর আগে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় ১ ইসরায়েলি সেনা নিহত ও আরও ৬ জন আহত হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘বাফার জোনের’ সাতটি শহরের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। যুদ্ধবিরতির আগেই ইসরায়েলের উত্তর সীমান্ত থেকে লেবাননের ভেতরে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা দখল করে নেয় ইসরায়েলি বাহিনী, এটিকেই ‘বাফার জোন’ বলে অভিহিত করছে তারা। এই সাতটি শহর লিটানি নদীর উত্তর পাশে অবস্থিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত