টেকনাফে অপহরণকারীরা বেপরোয়া

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২০ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালী এলাকায় ট্রিপল মার্ডারের পর অপহরণ ও মানব পাচার দমনে গত ২২ এপ্রিল যৌথ অভিযান চালায় নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু তাতেও থেমে নেই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। অভিযানের পরের দিন ২৩ এপ্রিল বাহারছড়ার নোয়াখালী পাড়া থেকে সিরাজ নামের এক শ্রমিককে একদল সন্ত্রাসী জোরপূর্বক পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় তার চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, খুন এবং গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় টেকনাফজুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্ক।

টেকনাফের বিশেষ করে পাহাড়সংলগ্ন এলাকাগুলোয় অপহরণ, খুন, গুম ও মানব পাচারের এক ভয়ংকর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। পাহাড়ের ভেতরে গোপন আস্তানায় মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়, আর সুযোগ পেলে সাগর পথে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় পাচার এটাই এখন এই অঞ্চলের নির্মম বাস্তবতা।

সম্প্রতি বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার এবং আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ৯ জন জীবিত উদ্ধার ও বহু নিখোঁজের ঘটনা সেই বাস্তবতাকে আবারও ভয়াবহভাবে সামনে এনেছে। অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পাহাড়ি-উপকূলের প্রায় ২০ হাজার মানুষ।

বাহারছড়ার শিলখালীর পাহাড়ঘেরা এলাকায় একটি মুদি দোকানে জমিসংক্রান্ত সালিশ শেষে বসে ছিলেন ৮-১০ জন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা। সবার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই অপহরণ ও মানব পাচারের ক্রমবর্ধমান বিস্তার।

স্থানীয় বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাহারছড়ায় এখন শুধু ভয়। সন্ধ্যা নামলে আমরা সন্তানদের বাইরে যেতে দিই না। কখন কাকে ধরে নিয়ে যায়, কেউ জানে না। প্রায় প্রতিদিনই অপহরণের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও পরে অপহরণ, খুন, ঘুম হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়।’

মুদি দোকানি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কখন কাকে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করবে বলা মুশকিল। আবার মুক্তিপণ না পেলে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তারা পাচার করে দেয় সাগর পথে।’

পাহাড়ের অন্ধকার আস্তানা থেকে ফিরে আসা মানুষের বিবরণ শুনলে গা শিউরে ওঠে। সম্প্রতি একটি মানব পাচারকারীর আস্তানা থেকে ফিরে আসা নুর আলম বলেন, চোখ খুলে দেখি চারপাশে দুই শতাধিক মানুষ বন্দি। প্রতিদিনই চলে নির্যাতন। তিনি জানান, তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ে অত্যাচার করা হয়। অন্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে টাকা দাবি করা হয়। নুর আলম বলেন, টাকা না পেলে তাদের মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যেদিন পালিয়ে আসি, সেদিন আরও কয়েকজন আটক ছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, মানব পাচার ও অপহরণ কার্যত একই অপরাধচক্রের দুটি মুখ। উপকূলজুড়ে সক্রিয় এই নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রলোভন, জোর-জবরদস্তি ও অপহরণের মাধ্যমে সাগর পথে পাচার করে আসছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী অন্তত তিন হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। এ সময়ে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১১৭টি মামলায় প্রায় এক হাজার ১০৭ জনকে আসামি করা হয় এবং ৬০০ পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপে মালয়েশিয়া পাচারের সময় নারী-শিশুসহ ২৬৩ জনকে উদ্ধার এবং ১০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়।

অপহরণ বেড়েছে : গত এক বছরে টেকনাফের বাহারছড়া, জাহাজপুরা, হ্নীলা, জাদিমুড়া ও হোয়াইক্যং এলাকায় প্রায় ১৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত জানুয়ারি মাসে তিন দিনেই প্রায় ৩০ জনকে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

মুক্তিপণ ও খুন : অপহৃতদের ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে সন্ত্রাসীরা মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করছে। মুক্তিপণের টাকা না পেলে বা পুলিশের কাছে অভিযোগ  করলে অপহৃতদের হত্যা করে লাশ গুম করার ঘটনাও ঘটছে। ডাকাত ও অপহরণের ভয়ে স্থানীয় যুবকরা রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন।

পাহাড়ি আস্তানা : রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের কয়েকটি চক্র পাহাড়ের গহিনে আস্তানা গড়ে এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে। প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে টেকনাফ সদর, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়ার বিভিন্ন গ্রাম।

বাহারছড়া ও কচ্ছপিয়া ঘুরে জেলে, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে অপহরণ ও মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র মিলেছে। তাদের মতে, এসব অপরাধের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ মাদক ও পণ্যের চোরাচালান, মানব পাচার চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়হীনতা।

টেকনাফ উপজেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি আব্দুল জব্বার বলেন, অপহরণ ও মানবপাচার একই সূত্রে গাঁথা। শক্তিশালী এই চক্র ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জরুরি। ২০১৫ সালের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে। বাহারছড়ার ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহ জানান, অপহরণ ও মানব পাচার বেড়ে যাওয়ায় তার এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পাচারকারীদের তালিকা পুলিশের কাছে আছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাছ ধরার নৌযানগুলো নিবন্ধন ও চিহ্নিত করার দাবিও জানান তিনি। কারণ এসব নৌযানই পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি পর্যটকদের সতর্ক করে বলেন, মেরিন ড্রাইভে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা চলাচল থেকে বিরত থাকা উচিত। শিলখালী, বড় ডেইল, গর্জন বাগান, বাঘঘোনা, কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়ার এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, নৌবাহিনীসহ যৌথ বাহিনী বাহারছড়াসহ পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২২ এপ্রিল অভিযানে অপহরণ ও মানব পাচারকারীদের কয়েকটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করা হচ্ছে।

গত ২১ এপ্রিল শিলখালীর পাহাড়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নিহত রবির পিতা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করেছেন।

গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যা পর কচ্ছপিয়া এলাকায় চিত্রশিল্পী ইব্রাহিম দেয়ালে চিত্র আকার সময়ে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় হৈ-হুল্লোড়ের পর অপহরণের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে অপহৃতদের উদ্ধার করলেও অপহরণ চক্রের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়রা এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী মুক্তির জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত