১০ লাখ এআই ক্যামেরার জালে সারা দেশ

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৪ এএম

অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের আদলে বাংলাদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধী ধরতে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমতা) ক্যামেরা বসানো হবে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এজন্য ১০ লাখ এআই ক্যামেরা কিনবে বাংলাদেশ পুলিশ। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১৩শ কোটি টাকা। অপরাধ দমনে এআই ক্যামেরা অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রযুক্তি। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী শনাক্ত, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও সন্দেহজনক গতিবিধি রিয়েল-টাইমে চিহ্নিত করতে পারে।

ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ৬৪ জেলা ও সব মহানগর এলাকা এআই ক্যামেরার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের সবকটি মহাসড়কও আসবে আইআইর আওতায়। আগামী দুই বছরের মধ্যে ক্যামেরাগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকার বিভিন্ন স্থানে এআই ক্যামেরা বসিয়ে সফলতা পাওয়া গেছে। তাই ঢাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও মূল সড়কসহ আনাচে-কানাচে ক্যামেরা বসাবে পুুলিশ। ক্যামেরাগুলো ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ। এ নিয়ে এসব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের। 

এই প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে ১৬টি পয়েন্টে ৩৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। চালকদের মাঝে সচেতনতা এসেছে, আইন ভাঙার প্রবণতাও কমেছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর দুই শতাধিক পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হলে ঢাকার বড় একটি অংশ নজরদারির মধ্যে চলে আসবে। গাড়ি চুরি রোধেও কাজ করছে এআই ক্যামেরা। অপরাধীদের ধরতেও এআই ক্যামেরার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার সফলতায় উৎসাহ জোগাচ্ছে : পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমান বিশে^র শক্তিশালী হাতিয়ার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন নগরী যেমন সিসি ক্যামেরা ও এআই ক্যামেরার মাধ্যমে লন্ডনের ‘রিং অব স্টিল’ কিংবা চীনের ‘স্কাই নেট’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো অপরাধ হ্রাস করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের শহরগুলোতে ক্রমাগত জনসংখ্যার চাপ, যানজট এবং আধুনিক ধাঁচের অপরাধ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। সাধারণ সিসি ক্যামেরা কেবল ফুটেজ রেকর্ড করতে পারে, কিন্তু তা রিয়েল-টাইমে কোনো অপরাধ শনাক্ত করতে সক্ষম নয়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশেষায়িত নজরদারি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। রাজধানীতে এআই ক্যামেরা চালুর মাধ্যমে ট্রাফিক তদারকিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতে যেমন যানজট কমছে তেমনি সড়কের শৃঙ্খলাও ফিরছে। এতে পুলিশ কর্তারা আশাবাদী হয়ে উঠছেন। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দেশনা দেন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এআই ক্যামেরা স্থাপনের।

আনা হচ্ছে সব জেলা ও মহানগর এলাকা : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি জেলা শহর, মহানগর এলাকা ও মহাসড়ক এআই ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। প্রায় এক লাখের বেশি ক্যামেরা ক্রয় করা হবে। আপাতত ৫শ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হবে। এতে অপরাধ ও ট্রাফিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রথাগত ক্যামেরার সঙ্গে এআই ক্যামেরার পার্থক্য হলো এদের ‘স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা’। এই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলো যেকোনো দ্রুতগতি যানবাহনের নম্বর প্লেট মুহূর্তের মধ্যে স্ক্যান করে জাতীয় ডেটাবেজের সঙ্গে মেলাতে পারবে। তা ছাড়া কোনো অপরাধী পালিয়ে গেলেও সহজেই ধরা পড়বে। জনবহুল এলাকায় ঝোলানো ক্যামেরাগুলো একসঙ্গে হাজারো মানুষের মুখের অবয়ব স্ক্যান করতে পারবে। আদালতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি, পরোয়ানাভুক্ত অপরাধী কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ডেটাবেজে থাকলে ক্যামেরা তাদের শনাক্ত করতে নিকটস্থ কন্ট্রোল রুমে সংকেত পাঠাবে। কোনো স্থানে অনেক মানুষের অস্বাভাবিক জটলা, মারামারি, আগুন লাগা বা দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত বস্তু পড়ে থাকতে দেখলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বাজাবে।

‘জাদু’ নিয়ে পুলিশ মাঠে : পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা আর জনমনে স্বস্তি ফেরাতে ‘জাদু’ নিয়ে মাঠে নেমেছে তারা। যানজট থেকে রাজধানীবাসীকে মুক্তি দিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ক্যামেরার ব্যবহার সুফল দিচ্ছে। সহজে সড়কে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে। অতীতে নানা উদ্যোগের কোনোটিই সফল হয়নি। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর বেশিরভাগ সড়কে ফিরেছে শৃঙ্খলা। এখন ট্রাফিক পুলিশকে হাতের ইশারাও দেওয়া লাগছে না। কেউ আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতাও করছে না।

একেকটি ক্যামেরার দাম ৫২ হাজার টাকা : এআই ক্যামেরা সহজেই কম্পিউটার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেক দূর থেকেও স্পষ্ট ছবি শনাক্ত করতে পারে। একেকটি ক্যামেরার দাম পড়বে ৫২ হাজার টাকার বেশি। ক্যামেরার সফটওয়্যারে ৬ ধরনের আইন অমান্যের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করবে ক্যামেরা। ইতিমধ্যে সফটওয়্যারের সঙ্গে বিআরটিএ সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের নম্বর দিয়েই জরিমানা বা মামলার তথ্য মুঠোফোনে চলে যাচ্ছে মালিকদের কাছে। একই কায়দায় অপরাধীদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে আসছে ক্যামেরা : পুলিশ সূত্র জানায়, কোন দেশ থেকে ক্যামেরাগুলো ক্রয় করা হবে তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবে চীন থেকেই আনার সম্ভাবনাই বেশি। উন্নতমানের এআই ক্যামেরায় বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। কেনাকাটায় স্বচ্ছতায় বিশেষ নজর দিচ্ছে পুলিশ। ক্যামেরাগুলো ঘোর অন্ধকার, কুয়াশা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও পরিষ্কার ছবি ও অবয়ব শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। এ প্রসঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোট ১০ লাখ ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা আছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাইসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে ক্যামেরা কেনা হবে। তবে চীন থেকে আসবে বেশি। ওইসব দেশ কারিগরিভাবেও আমাদের সহায়তা করবে।

অপহৃত ও নিখোঁজদের বিষয়েও তথ্য আসবে : অপরাধ ঘটার পর পুলিশি তদন্তের চেয়ে ‘অপরাধ ঘটার আগেই তা রোধ করা’ বা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই প্রধান উদ্দেশ্য। শহরের হটস্পটগুলোতে ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম সক্রিয় থাকলে পেশাদার অপরাধীদের উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা যাবে। ঘটনার পর অপরাধী যদি গাড়িতে করে পালিয়ে যায়, এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গাড়ির নম্বর প্লেট ট্র্যাক করে পরবর্তী প্রতিটি মোড়ে পুলিশকে তার অবস্থান জানিয়ে দেবে। অপহৃত ব্যক্তি বা নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে ফেসিয়াল ডেটাবেজ প্রযুক্তি বিশেষ সহায়ক হবে।

৯৯৯-এ যুক্ত থাকবে ক্যামেরা : সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধান সমস্যা আইন না মানার প্রবণতা। সিগন্যাল অমান্য করা, রং সাইডে গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরা, ট্রাফিক লাইন অতিক্রম করা বা নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালালে স্বয়ংিক্রভাবে ই-মামলা তৈরি হবে এবং মালিকের মোবাইলে মেসেজ চলে যাবে। নির্দিষ্ট রোডে গাড়ির চাপের ওপর ভিত্তি করে এআই সিস্টেম সিগন্যালের সবুজ ও লাল বাতির সময়সীমা নিজে থেকেই সামঞ্জস্য করবে। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস বা আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত গাড়ি দেখলে এআই ট্রাফিক সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন খালি করে গ্রিন সিগন্যাল তৈরি করবে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর ডেটাবেজের সঙ্গে ক্যামেরা নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকবে। এতে কোনো নাগরিক ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে সাহায্য চাইলে ঘটনাস্থলের নিকটস্থ এআই ক্যামেরার লাইভ ফিড অপারেটরের সামনে দৃশ্যমান হবে। 

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকবে কঠোর : পুলিশ জানায়, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর ‘ডেটা সুরক্ষা আইন’ মেনে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হবে। ডেটা সেন্টারের সুরক্ষায় জাতীয় স্তরের ফায়ারওয়াল এবং এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক হবে। ক্যামেরাগুলো পরিচালনার জন্য পুলিশ ও কারিগরি দলগুলোকে এআই ডেটা বিশ্লেষণ এবং সিস্টেম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ দেবে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো। এই নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সব মহাসড়কে বসবে ক্যামেরা : দেশের সব মহাসড়কেই বসবে এআই ক্যামেরা। আগস্টের শেষের দিকে ঢাকা-মাওয়া সড়কে স্থাপন হবে ক্যামেরা। হাইওয়ে পুলিশ এ নিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। অন্যান্য সড়কেও ক্যামেরাগুলো কীভাবে বসাবে তার পরিকল্পনাও অবহিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তরকে। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-খুলনাসহ আঞ্চলিকসহ অন্যান্য সড়কেও ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। ক্যামেরাগুলো স্থাপনের ফলে যানবাহন মনিটরিং, অতিরিক্ত গতি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ, জরিমানা আদায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আগামী বুধবার থেকে এআই প্রযুক্তিনির্ভর অটো ফাইন সিস্টেম চালু করছে হাইওয়ে পুলিশ। এর ফলে ওভারস্পিড, অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে যানবাহন চালনাসহ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যবস্থায় আইন অমান্যকারী যানবাহনের মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য প্রেরণ করা হবে। এটা মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত