শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

মহান মে দিবসকে কেন্দ্র করে নানা আড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতা আমরা দেখি। অনুষ্ঠানগুলোতে প্রকৃত অর্থে, শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নগণ্য। বেশিরভাগই শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শাসকশ্রেণির লেজুড় শ্রমিক সংগঠন, রাজনীতিক ও দলীয় কর্মী, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সরব উপস্থিতি থাকে। শ্রমিক সমাবেশ-র‌্যালি ইত্যাদি নানামুখী কর্মযজ্ঞে শ্রমিকের স্বার্থে মুখে ফেনা তোলে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী রাজনীতিক এবং তাদের তাঁবেদার ব্যক্তিরা। আমাদের শাসক শ্রেণির সব পর্যায়ের নেতাদের মুখে শ্রমিক স্বার্থের খই ফোটে। শ্রমিক অন্তঃপ্রাণ আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব স্তরের নেতৃবৃন্দের শ্রমিকদের প্রতি অধিক মমত্ববোধ আগামীকাল উপচে পড়বে। তখন বাক্যবানে শ্রমিকদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বছরের এই একটি দিনে সবাই শ্রমিক অন্তঃপ্রাণ হয়ে ওঠে। অথচ দিনটি গত হওয়ার পর বছরের তিনশ চৌষট্টি দিনের একটি দিনও, শ্রমিকদের নিয়ে ভাবনার অবকাশ কারও থাকে না। স্বাধীনতার ৫৫ বছর ধরে মে দিবসে অভিন্ন কীর্তিকলাপ আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত স্বার্থরক্ষার উপায় নেই।  বিদ্যমান ব্যবস্থাটি হচ্ছে, শ্রম শোষণের এবং শ্রমিক নিগ্রহের উর্বর ক্ষেত্র। সে ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষা ও সুরক্ষার উপায় নেই। শ্রমিক মাত্রই শ্রমবাজারে শ্রম বিনিয়োগ করবে এবং বিনিময়ে পাবে মজুরি। প্রাপ্ত মজুরিতে শ্রমিকের চাহিদা পূরণ হবে কি-হবে না, সে বিবেচনা করা হয় না। অথচ শ্রমিকের শ্রমে একচেটিয়া মুনাফা লুটে নেওয়ার বৈধতা পেয়েছে শ্রম-শোষক চক্র। হরেক প্রকার মুনাফানির্ভর পণ্যের মতো, আমাদের দেশে শ্রমিকও মুনাফানির্ভর পণ্যে পরিণত। শ্রম বেচে শ্রমিক কেবল মজুরি পাবে, এর বেশি নয়। শ্রমিকের শ্রমে মুনাফাবাজ চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লাগামহীন মুনাফা।

একজন শ্রমিকের তুলনায় শিল্প মালিক অধিক পরিশ্রম করে বটে। সেটা কায়িক-মানসিক উভয় ক্ষেত্রে হতে পারে। কিন্তু শিল্প মালিক শ্রমজীবী নয়। তার শ্রমের সঙ্গে মজুরির সম্পর্ক নেই। রয়েছে মুনাফার সম্পর্ক। মজুরি সীমিত কিন্তু মুনাফা অঢেল এবং লাগামহীন। বণিক পুঁজির লুণ্ঠনকারী। সেই পুঁজির ফাঁদে আটকে যাচ্ছে শ্রমিক। পুঁজি বিনিয়োগে শিল্প-কারখানা গড়লেও, শ্রমিক ব্যতিরেকে পণ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিক অপরিহার্য এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিককে কেবল মজুরি গ্রহণে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, মুনাফা অংশীদারত্ব শ্রমিকের নেই। সেই মুনাফা ভোগ করে পুঁজির লগ্নিকারকরা। মধ্যযুগীয় দাসপ্রথা এবং শ্রম-শোষণের সামন্তযুগের অবসানের পর শ্রমিকের ইচ্ছার স্বাধীনতা এসেছে। সে কোথায় শ্রম বেচবেÑ এই অধিকার সে পেয়েছে। ইচ্ছানুযায়ী কর্মক্ষেত্র বেছে নিতে পারছে। যেটা পূর্বে ভাবা পর্যন্ত যেত না। দাসযুগ-সামন্তযুগ থেকে বুর্জোয়া উত্তরণে শ্রমিকের কিছু স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সত্য, কিন্তু বিদ্যমান বুর্জোয়া ব্যবস্থায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের উৎপাদনের বিনিময়ে অর্জিত মুনাফার অংশীদারত্ব পাওয়ার উপায় নেই। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, শ্রমিক কেবল শ্রম বেচে না। উৎপাদিত পণ্যের অংশীদারত্ব পেয়ে থাকে। আমরা যে চা-পান করি, সে চায়ের মূল উৎপাদনকারী দেশ চীন। এখন চীনের সেই চা-বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতবর্ষের বেশ কিছু অঞ্চলে চায়ের আবাদ শুরু হয়। সে সব চা-বাগানের সিংহভাগ মালিকানা ছিল ইংরেজদের। চা-বাগানের শ্রমিকের ন্যায় অমানুষিক পরিশ্রম ভারতবর্ষের সব অঞ্চলের মানুষের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। দক্ষিণ ভারতের তামিল-তেলেগু জাতির শ্রমিকরা এই পেশায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার অন্তর্গত শ্রীলংকায় চা-বাগানের শ্রমিকরূপে তামিলদের স্বয়ং ইংরেজরা সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। এর পূর্বে শ্রীলংকায় তামিল জাতির আগমন ঘটেনি।

ব্রিটিশ শাসনামলের ধারাবাহিকতায় আজও প্রতিটি চা-বাগানের শ্রমিক আবাসের পাশে শুঁড়িখানার অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। দিনমান অমানুষিক পরিশ্রমের পর শ্রমিকদের মদ্যপানের নেশায় চেতনা বিনাশের ব্যবস্থাটি ঔপনিবেশিক শাসক ইংরেজ চাতুর্যে চালু করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, শ্রমিকের সেই চেতনানাশক শুঁড়িখানা আজও প্রতিটি চা-বাগানের শ্রমিকদের আবাস সংলগ্নে রয়েছে। শ্রম-শোষণে নানা ফন্দি আঁটা হয়ে থাকে। শ্রমিকরা যাতে অসন্তোষে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে না পারে, সেই কারণে শ্রমিকের চেতনানাশের অভিনব ব্যবস্থাটি আজও অক্ষুণœ রয়েছে। ক্ষমতা ও ভোটের রাজনীতিতে শ্রমিকরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই সহজ সত্যটির কারণেই, তারা একদিনের জন্য শ্রমিক অন্তঃপ্রাণ হয়ে ওঠে। দলীয় রাজনীতিতে শাসকশ্রেণি স্বীয় রাজনৈতিক মতলবে শ্রমিকদের ব্যবহার করে যাচ্ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনরূপে শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতায় থাকা না থাকার দ্বন্দ্ব-বিভাজনে, শ্রমিকরাও ভাগবাটোয়ারা হয়ে পড়েছে। মালিক-শ্রমিকের মজুরির দ্বন্দ্বে আমাদের শাসক দলগুলো কখনো শ্রমিকের পক্ষ গ্রহণ করে না। শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে মালিক পক্ষে নির্লজ্জ অবস্থান নেয়। অথচ এরাই শ্রমিক দিবসে পালন করে আড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতা। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির প্রশ্নে মালিক পক্ষের ঘোষণাকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণে শাসক দলগুলো নানা যুক্তি তুলে ধরে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ সাম্রাজ্যবাদী সংস্থার দাসখতে আমাদের শাসক দলগুলো কেবল শ্রমিকের স্বার্থ নয়; দেশের সার্বভৌমত্ব, দেশের সম্পদ পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে বিলম্ব করেনি এবং করছেও না। এরা মুখে মুখে শ্রমিকের স্বার্থে ঝড় তোলে। সেটা সম্পূর্ণরূপে বাকসর্বস্ব এবং রাজনৈতিক মতলবে। প্রকৃতই তারা শ্রমিকবিরোধী এবং মালিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী। এই শাসক শ্রেণির দলগুলোর নেতাদের মুখে শ্রমিকের স¦ার্থে বক্তৃতা-বিবৃতি-মাছের মায়ের কান্নার সমতুল্য। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রকৃত কৃষকের জমি নেই। জমির মালিকরা সামন্তযুগের অনুরূপ সুবিধাভোগী। কৃষকমাত্রই কৃষি-শ্রমিক কিংবা বর্গা-চাষিরূপে অন্যের জমিতে ফসল উৎপন্ন করে উৎপাদিত পণ্যের অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকে। আর বাকি অর্ধেক অংশ তুলে দেয় জমির মালিকের গোলায়। উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন জমির মালিকরা মুনাফা ঘরে বসে পেয়ে থাকে, বিনা পরিশ্রমে। ব্যবস্থাটি সামন্তযুগের আদলে কিন্তু বাংলাদেশে শক্ত ভিত্তির ওপর ব্যবস্থাটি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে।

শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। মালিক-শ্রমিক দুপক্ষের নানা টানপড়েনে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলো ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মালিক-শ্রমিকের বিদ্যমান দ্বন্দ্ব-অনাচার নিরসনে তাদের ভূমিকা শূন্য। শ্রমশোষণের ব্যবস্থাটি অপরিবর্তিত রেখেই মালিক এবং শ্রমিকের মজুরি সংক্রান্ত নানা বিতর্ক অবসানে ট্রেড ইউনিয়ন হস্তক্ষেপ করে থাকে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বিপ্লবের ভাবনা যারা ভাবতেন, তাদের উদ্দেশ্যে লেনিন অত্যন্ত দৃঢ়তায় উপহাস করেছেন। ট্রেড ইউনিয়ন বিপ্লবী আদর্শ-অঙ্গীকারে ব্রত কোনো সংগঠন নয়। শ্রেফ শ্রমিকের মজুরির দরকষাকষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শ্রমিকের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের অতিরিক্ত কিছু করণীয় তাদের পক্ষে অসম্ভব। ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিকদের মজুরি সচেতন করে সত্য; তবে শ্রেণি সচেতনতায় সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। মালিক-শ্রমিকের বিদ্যমান ব্যবস্থা মেনে ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা সীমিত। সে কারণে ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা শ্রমিক সংগঠনগুলো দূতালিরূপে কাজ করে থাকে। দেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক নেতাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত। আমাদের শ্রমিক নেতারা যতটুকু শ্রমিকের অনুকূলে, তার চেয়ে অধিক স্বীয় রাজনৈতিক দলের আনুগত্যে অনুগত। আমাদের শ্রমিকদের উন্নতি না হলেও শ্রমিক নেতাদের অভাবনীয় উন্নতি কিন্তু আমাদের নজর এড়াতে পারেনি। শ্রমিক নেতাদের সাংসদ-মন্ত্রিত্ব লাভ নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর হতে এযাবৎ সব বৈধ-অবৈধ সরকারের শাসনামলে সাংসদ-মন্ত্রিরূপে তাদের আমরা দেখে এসেছি।

বিশে^র সভ্যতা, উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক বিকাশে শ্রমিক শ্রেণির অবদান অপরিসীম। অথচ বিদ্যমান ব্যবস্থায় তারা উপেক্ষিত এবং বঞ্চিত। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মূলে প্রবাসী এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের অবদানের কথা কারও অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রবাসী এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের প্রাপ্য মূল্যায়ন-স্বীকৃতি, রাষ্ট্র-সরকার দেয় কি? না দেয় না। বিদেশে যারা যায় তারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে নয়, একান্তই ব্যক্তিগত উদ্যোগে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বহু কষ্টে বিদেশে পাড়ি দেয়। তাদের স্বার্থরক্ষায় একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। যার নাম প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এযাবৎ বিদেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকের কল্যাণে মন্ত্রণালয় যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে, তেমন নজির পর্যন্ত নেই। গার্মেন্ট সেক্টরে মজুরি সংক্রান্ত শ্রমিকদের নানা বিড়ম্বনা রয়েছে। তা নিরসনে কোনো সরকারই শ্রমিকের স্বার্থে ভূমিকা রাখেনি। দুর্ঘটনা নামক ফাঁদে এযাবৎ কত শত শ্রমিক প্রাণ দিয়েছে তা নিরূপণ সম্ভব হয়নি। অগণিত শ্রমিক হত্যার বিচার না হলে এর ধারাবাহিকতা বন্ধ হবে না। ক্রমেই আরও ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। সর্বাগ্রে দেশবাসী শ্রমিক হত্যায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে এসেছে। সভ্যতা-মানবতার এরূপ স্খলনে বিশ্ববিবেক নড়ে ওঠে অথচ আমাদের রাষ্ট্র-সরকার এবং শ্রম-শোষকরা কেবল মৃত শ্রমিকের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দায়িত্ব শেষ করেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এ ধরনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা আমাদের হতেই থাকবে। তাই অতি জরুরি ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন। পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকারের কাছ থেকে শ্রমিকের আনুকূল্যের উপায় নেই। এটা নির্ভর করবে বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে এবং সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরে। বিগত ৫৫ বছরের পহেলা মে দিবস উদযাপনে ন্যূনতম ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়নি। মে দিবসকে কেন্দ্র করে দলবাজি-ক্ষমতাবাজির রাজনীতি আমরা প্রত্যক্ষ করে এসেছি। যার রূপ ও ছবি ভিন্ন বারতা নিয়ে এযাবৎ আসেনি। আগামীতে আসবে না, ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে না? তা-ই-বা বলি কীভাবে? ইতিহাসের শিক্ষা নিশ্চয়ই তা বলে না।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত