যুক্তরাষ্ট্রের রাজত্বে চীনের ভাগ!

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৮ এএম

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে ‘তথ্য’ এই শতাব্দীতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আর এই হাতিয়ার দিয়েই একে অপরের ওপর ছড়ি ঘোড়াচ্ছে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো। প্রযুক্তি বিপ্লবের পর থেকে তথ্য নিয়ন্ত্রণ বা যুদ্ধের ময়দানে তথ্যের লড়াই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে আধুনিক ফ্রন্টলাইনগুলোর আড়ালে পৃথিবীর কক্ষপথে চলছে এক নীরব কিন্তু তীব্র ‘স্যাটেলাইট’ প্রতিযোগিতা। দীর্ঘ সময় ধরে এ ক্ষেত্রটিতে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ-মহাকাশে সেই একচেটিয়া আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’ এবং ‘ভ্যান্টর’-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোযুদ্ধক্ষেত্র, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং মানবিক সংকটের ওপর বিশ্বের বাণিজ্যিক নজরদারির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে।

সাংবাদিক, গবেষক, সাহায্য সংস্থা এবং সামরিক বিশ্লেষকদের জন্য এই হাই-রেজুলিউশন ছবিগুলো এখন অপরিহার্য। সেনা সমাবেশ ট্র্যাক করা থেকে শুরু করে বোমার আঘাতের ক্ষয়ক্ষতির নথিভুক্তিকরণ কিংবা গণবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড উন্মোচনবাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলো রিপোর্টিং এবং ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শুধু প্রযুক্তিগত নেতৃত্বই নয়, বরং স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ সক্ষমতা, পুঁজি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল ওয়াশিংটনের হাতে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্ল্যানেট ল্যাবস উপসাগরীয় অঞ্চলের স্যাটেলাইট ইমেজের ক্ষেত্রে ৪ দিনের ‘ডিলে’ বা বিলম্ব সময় বাড়িয়ে ১৪ দিন করে দেয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিপক্ষ বা শত্রুপক্ষ যাতে এই ডেটা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্যই এই পদক্ষেপ। পরবর্তী সময়ে কোম্পানির নোটিসে বলা হয়, তারা ইরান এবং আশপাশের সংঘাতসংশ্লিষ্ট এলাকার সাম্প্রতিক ছবি প্রকাশ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে ভ্যান্টরও ওই অঞ্চলটির নির্দিষ্ট কিছু এলাকার ছবির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, সংবেদনশীল ভূ-স্থানিক তথ্য যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিপদে ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।

যদিও এই কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পরিচালিত, তবুও তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রিমোট-সেনসিং কোম্পানিগুলো দেশটির ফেডারেল বিধিবিধানের অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত, যা ওয়াশিংটনকে জাতীয় নিরাপত্তা বা বৈদেশিক নীতির স্বার্থে যেকোনো সময় ইমেজের সংগ্রহ বা বিতরণ সীমিত করার ক্ষমতা দেয়। প্ল্যানেট ল্যাবসের ব্যাপ্তি থেকেই বোঝা যায় কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির প্রায় ২০০টি স্যাটেলাইট প্রতিদিন পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগের ছবি তুলতে সক্ষম। কিন্তু এই তথ্যের প্রবেশাধিকার সংকুচিত হওয়ায়, এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার মতো কোম্পানিগুলো এখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

তবে চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোকেও এখন আর উপেক্ষা করা কঠিন। মিজারভিশন এবং চ্যাং গুয়াং স্যাটেলাইট টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে, চীন এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ইমেজিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। মহাকাশ শিল্প বিশ্লেষক এবং আলফা-টু কনসাল্টিং-এর পার্টনার অ্যাড্রিয়ান নরিস বলেন, সামরিক ইমেজিং স্যাটেলাইটে যুক্তরাষ্ট্রের এখনো নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব রয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিক আর্থ-অবজারভেশন এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, কয়েক বছর আগেও চীনের হাই-রেজুলিউশন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছিল না। কিন্তু আজ তারা এমন সক্ষমতা অর্জন করেছে যে, প্রতিদিন পৃথিবীর যেকোনো পয়েন্টের একাধিক হাই-রেজুলিউশন ছবি তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব। নরিস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, আজ থেকে পাঁচ বছর পর মহাকাশ থেকে তোলা বাণিজ্যিক ছবির ওপর আর কারও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

ছবির গুণগত মানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইটগুলো চীনাদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু স্যাটেলাইটের সংখ্যার বিচারে চীন এখন শীর্ষস্থানে রয়েছে। এই পরিবর্তনই ওয়াশিংটনকে চিন্তায় ফেলেছে। একটি ফাঁস হওয়া মেমো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের মিত্রদের চীনা স্যাটেলাইট পরিষেবা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। ইরান যুদ্ধ ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে দিয়েছে  তথ্য বাণিজ্যিক হতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের প্রবেশাধিকার এখনো রাজনৈতিক। আগামী কয়েক বছরে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারের মাধ্যমে আরও ১ হাজার নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশ থেকে তোলা ছবির সহজলভ্যতা যেমন বাড়বে, তেমনি তা কোনো একক শক্তির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। ইরান যুদ্ধ হয়তো শুধু একটি সামরিক সংঘাত হিসেবেই নয়, বরং মহাকাশ থেকে বিশ্বকে দেখার ক্ষেত্রে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য অবসানের মুহূর্ত হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত