হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয় মেয়াদে বসার পর এক বছর পেরোতেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয়তা কমছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথভাবে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে মাত্র ৩৪ শতাংশ নাগরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে সমর্থন করেন; এর আগে ১৫ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত রয়টার্স/ইপসোসএর আরেকটি জরিপে এ হার ছিল ৩৬ শতাংশ। এই হার তার চলতি মেয়াদে তো বটেই, এমনকি আগের মেয়াদেরও প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর ট্রাম্পের নেওয়া বিতর্কিত অবস্থানের কারণেই সাধারণ জনগণের মধ্যে এই চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী এই জরিপের ফল ট্রাম্প শিবিরের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার প্রতি জনসমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। বিস্ময়কর তথ্য হলো, ট্রাম্পের ২০১৭-২০২১ মেয়াদে জনপ্রিয়তার সর্বনিম্ন হার ছিল ৩৩ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতি সেই রেকর্ড ভাঙার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তার বর্তমান রেটিং মাত্র ২৭ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় সন্তুষ্ট মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ। ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের বড় একটি অংশ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং তার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেক ভোটারই মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সংস্কারের চেয়ে বিদেশের মাটিতে ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা বর্তমান প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অস্বস্তি বাড়ছে। যদিও দলীয় কর্মীদের ৭৮ শতাংশ এখনো ট্রাম্পের পাশে আছেন, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলোদলের ৪১ শতাংশ সমর্থকই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ব্যর্থতায় অসন্তুষ্ট। আগামী নভেম্বরে হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করবেন মূলত ‘স্বতন্ত্র’ বা নির্দলীয় ভোটাররা। আর সেখানেই বড় বিপদে আছে রিপাবলিকানরা। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ১৪ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা রিপাবলিকানদের জন্য নভেম্বর মাসে একটি বড় পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করে এসেছেন যে তার সময়ে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কিন্তু রয়টার্স/ইপসোসের ডাটা বলছে ভিন্ন কথা। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তার পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অকার্যকর বলে মনে হচ্ছে। রয়টার্স ও ইপসোসের এই জরিপটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মোট ১ হাজার ২৬৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন ছিলেন নিবন্ধিত ভোটার। এই জরিপের ফল দেশটির রাজনীতির বর্তমান মেরূকরণ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি বাড়তে থাকা অনাস্থার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে। একদিকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলায় তিনি যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারেন, তবে তার জনপ্রিয়তায় আরও ধস নামার শঙ্কা রয়েছে। হোয়াইট হাউজের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো গুলি এবং যুদ্ধের উত্তাপ সরিয়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজারের দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তা নিশ্চিত করা।