টিটন হত্যার নির্দেশ আসে মালয়েশিয়া থেকে

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একসময়ের অপ্রতিরোধ্য ডন ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের শ্যালক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে অপরাধজগৎ। গোয়েন্দাসূত্র বলছে, মালয়েশিয়া থেকে ইমনের নির্দেশেই এ হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। হত্যার ঘটনায় ডিএমপির নিউমার্কেট থানায় করা মামলায় ৯ জন অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তিকে আসামি করেছেন তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।

গতকাল বুধবার নিউমার্কেট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওসি বলেন, টিটনকে হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন মামলা করেছেন। ৮-৯ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনের বটতলায় টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের নাম ছিল। ৫১ বছর বয়সী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের স্ত্রীর বড় ভাই। পুলিশ বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যকার অন্তঃকোন্দলে টিটনকে হত্যা করা হতে পারে। তাই এ হত্যাকা-ে ইমনসহ সন্দেহভাজন ও সন্দেহজনক সবকিছুকে সামনে রেখে তদন্ত করছে তারা।

বাদী এজাহারে বলেন, দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পায় টিটন। সে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তার সঙ্গে কথা বলত। ভালোভাবে কাজ করে জীবন যাপন করার জন্য দোয়া চাইত। কিছুদিন আগে অ্যাপের মাধ্যমে জানায়, বড় ভাই আমি একটা শিডিউল কিনছি। ইনশাআল্লাহ মোটামুটি কাজের মধ্যে থাকতে পারব। গত ২৬ এপ্রিল ফোন দিয়ে জানায়, ‘আমার সঙ্গে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ডাগারি রনিদের বছিলা গরুর হাটের ইজারার শিডিউল নিয়ে ঝামেলা চলছে।’ ২৭ এপ্রিল টিটন বলে, ‘আমাকে ডাকছে উভয়ের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করার জন্য।’ এরপর ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে জানতে পারি, ‘ঢাকা নিউমার্কেটের কাছে শাহনেওয়াজ হলের সামনে থেকে আমার ছোট ভাই টিটনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ গোয়েন্দাসূত্রে জানা গেছে, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর টিটন বুঝতে পারেন তার জীবন ঝুঁকিতে আছে। তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর কারাগারে থাকায় তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছিল না। এনআইডি কার্ড করতে না পারায় পাসপোর্ট তৈরি করতে পারেননি। ফলে দেশত্যাগে ব্যর্থ হন তিনি। এরপরই নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ‘লাপাত্তা’ হয়ে থাকতেন।

ওই সূত্র বলছে, টিটনের আপন ভাই টুটুলকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন ইমন। ভাইয়ের এই করুণ মৃত্যু টিটন ও ইমনের আত্মীয়তার সম্পর্কে চিড় ধরিয়ে দেয় এবং তাদের মধ্যে স্থায়ী শত্রুতা তৈরি হয়। জেল থেকে বের হওয়ার পরই দুজন-দুজনের টার্গেট হন। কিন্তু ইমন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের মধ্যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে সংঘাত চরমে পৌঁছায়। ইমন মনে করতেন, টিটন বেঁচে থাকলে তার একক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। এ আশঙ্কা থেকেই হত্যাকা-ে নেতৃত্ব দিয়ে থাকতে পারে ইমনের ডান হাত তপন সানি। ইজাজ ওরফে হেজাজ মারা যাওয়ার পর সানি ইমনের গ্রুপের মূল ভূমিকায় আছেন। টিটন হত্যাকা-ের পর লাপাত্তা সানি।

২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি জামিনে থাকলেও আদালতে হাজিরা না দিয়ে পলাতক রয়েছেন।

লাশ হস্তান্তর : ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে টিটনের মরদেহ হস্তান্তর করেছে নিউমার্কেট থানা-পুলিশ। পুলিশ নিহতের শরীরে সাতটি গুলির চিহ্নের কথা উল্লেখ করেছে সুরতহাল প্রতিবেদনে। বুধবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে টিটনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা।

মর্গ থেকে লাশ বুঝে নেন তার বড় ভাই খন্দকার সাইদ আক্তার রিপন। তাদের বাড়ি যশোরের কোতোয়ালি উপজেলায়। সেখানেই টিটনের মরদেহ দাফন করা হবে বলে জানান রিপন। এর আগে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন নিউমার্কেট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোল্যা শাহাদাৎ। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তার মাথার ডান পাশে কানের ওপরে গুলির ক্ষতচিহ্ন, কপালে বাম ভ্রুর ওপরে একটি, পিঠের বাম পাশের নিচে একটি, ডান পাশের ওপরে একটি, বাম হাতের কনুইয়ে একটি ও কনুইয়ের নিচে একটি, বাম বগলের নিচে একটি গুলির ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। পেটের ডান পাশে ও কোমরের ওপরে রক্তাক্ত জখম রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত