মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি

নৌ অবরোধ দীর্ঘায়িত করার নির্দেশ ট্রাম্পের

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে তার সহযোগীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো নতুন করে সামরিক হামলা শুরু না করে বরং ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল সীমিত করা। এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতি এবং তেল রপ্তানির ওপর প্রবল চাপ বজায় রাখতে চায় ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ইরানকে নতুন করে আবার হুমকিও দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ভদ্র সাজার দিন শেষ। তিনি লেখেন, ইরান তাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। তারা জানে না একটি অপারমাণবিক চুক্তি কীভাবে করতে হয়। তাদের দ্রুত বুদ্ধিমান হওয়া উচিত। এই পোস্টের সঙ্গে নিজের একটি এডিট করা ছবিও প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। এতে দেখা যাচ্ছে তিনি চশমা পরা, আর তার হাতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল; ছবিটির পেছনের অংশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে এমন কিছু দেখা যাচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কিছু বৈঠকে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখায় তিনি অবরোধের পথটিকেই সবচেয়ে কার্যকর মনে করছেন। শান্তি প্রক্রিয়া যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখতে তিনি এই কঠোর অবস্থান বেছে নিয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ট্রাম্পের বিশ্বাস যে পুনরায় বোমা হামলা শুরু করা কিংবা যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি সরে আসার মতো বিকল্পগুলো বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই তুলনায় নৌ-অবরোধ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকির এবং কৌশলগতভাবে লাভজনক। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের অবস্থানে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প কখনো কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের কথা বলছেন, আবার কখনো আলোচনা ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।

তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে তেহরানের সামুদ্রিক চলাচলে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো তেলের চালান যেতে দেওয়া হবে না। আইআরজিসির নৌ শাখার সংস্কৃতিবিষয়ক উপপ্রধান সাঈদ সিয়াহ-সারানির বরাত দিয়ে দেশটির আধা-সরকারি মেহের নিউজ এই তথ্য জানিয়েছে। সিয়াহ-সারানি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইরান এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে এমনকি এক লিটার তেলও পার হতে দেবে না। আইআরজিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের হাত ট্রিগারে রয়েছে।’ ইরানের বাহিনীগুলো স্থল, জল এবং আকাশপথে দেশকে রক্ষা করতে এবং যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, হরমুজ প্রণালিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা মেনে নেওয়া যায় না। সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধেই এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হওয়া উচিত নয়। আঞ্চলিক সব দেশের এই প্রণালি অবাধে ব্যবহারের অধিকার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, প্রণালিটি বন্ধ হয়ে থাকলে বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে; জ¦ালানি সংকট ও খাদ্য অনিরাপত্তা দেখা দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আরোপের মতো যেকোনো প্রচেষ্টা আঞ্চলিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে জানান আনসারি।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসে জেরার মুখে পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এ প্রথম কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন তিনি। গতকাল বুধবার প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিস কমিটির এক শুনানিতে গসেথ আইনপ্রণেতাদের কঠোর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১.৫ ট্রিলিয়ন (দেড় লাখ কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে আলোচনার জন্য এ শুনানির আয়োজন করা হয়েছে। তবে বাজেটের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে, ইরানের ৫২টি জাহাজ দেশটির জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধ ভেঙেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি। স্থানীয় সময় গত সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত আগের তিন দিনের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং তথ্যের বরাত দিয়ে এ খবর জানানো হয়েছে। জাহাজগুলোর মধ্যে ৩১টি তেলবাহী ট্যাংকার ও ২১টি পণ্যবাহী জাহাজ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়।

তবে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে তেহরানের ‘ছায়া ব্যাংকিং’ খাতের সঙ্গে জড়িত ৩৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনের সেই সব স্বতন্ত্র তেল শোধনাগারের (টিপট রিফাইনারি) সঙ্গে লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যারা হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য ইরানকে টোল দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক দপ্তর (ওএফএসি) জানিয়েছে, এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে কয়েক হাজার কোটি ডলার লেনদেনে সহায়তা করেছে এবং ইরানের কথিত সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছে। ওএফএসি ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ইরান সরকারকে বা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য যারা অর্থ দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে লেনদেন করলে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে চীনের শানডং প্রদেশের স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ইরানি তেল আমদানি ও শোধনে জড়িত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত