নতুন শর্তে শিগগির দরপত্র

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম

দীর্ঘদিন স্থবির থাকা বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। যেখানে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মূল্য নির্ধারণ, মুনাফা ভাগাভাগি ও ব্যয় পুনরুদ্ধারসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পরিবর্তন এনে ২৬টি ব্লক উন্মুক্ত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এরই মধ্যে। অনুমোদন মিললে ১৫ মে’র মধ্যে দরপত্র আহ্বান করতে পারে পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আপত্তির জায়গাগুলো যেমন গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতার শর্তে সংশোধন এনে নতুন মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং চুক্তিতে (পিএসসি) সংশোধন করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন তারা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গ্যাসের মূল্য এখন ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি ৫ বছর পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা সমন্বয় করা হবে।

নতুন শর্তে বরাদ্দ পাওয়া ব্লকের ২০ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে, তবে অবকাঠামো ব্যয় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের সুযোগ বহাল থাকছে।

গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের ৫ বছরের গড় দামের ১১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে, যেখানে ন্যূনতম ৭০ এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার সীমা থাকবে। অগভীর সমুদ্রে এ হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের মডেলে ব্রেন্টের ১০ শতাংশ হারে মূল্য নির্ধারণ থাকলেও তাতে বিনিয়োগকারীদের সাড়া মেলেনি; কোনো কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি।

নতুন কাঠামোতে আন্তর্জাতিক আর্থিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাইবরের পরিবর্তে এসওএফআর  ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির সুপারিশে এসব পরিবর্তন আনা হয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। ২০১০ সালে চারটি ব্লকে কাজ শুরু হলেও কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই বিদেশি কোম্পানিগুলো সরে যায়। ২০১৬ সালের পর একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ৫৫টি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্য কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি বিনিয়োগে অনাগ্রহের বড় কারণ ছিল। নতুন সরকার সেই বাধাগুলো দূর করার চেষ্টা করছে।

অফশোরের পাশাপাশি স্থলভাগে ২১টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। তবে পার্বত্য এলাকার ২২এ ও ২২বি ব্লক বাদ থাকবে। বর্তমানে আইওসি শেভরন প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৩৩৯ টাকা এবং টাল্লো ২৮৪ টাকায় বিক্রি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে আসে ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। ২০৩০ সালে চাহিদা বেড়ে ৬৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক, যার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি ভোলাসহ স্থলভাগে দ্রুত অনুসন্ধান বাড়ানো এবং গ্যাস বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের প্রস্তাব দেন।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রায় ১০ শতাংশ অপচয় ও চুরি হচ্ছে, যা আমদানিকৃত এলএনজির ক্ষেত্রে বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ডেকে আনছে।

তথ্যানুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুদ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত