প্রকৌশলীদের বাজিতে ডুবেছে মহানগর!

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম

রোদ বৃষ্টি ঝড়ের পূর্বাভাস আমরা অনেক সময় আমলে নিই না। এই আমলে না নেওয়ার কারণেই এবার ডুবেছে চট্টগ্রাম। আবহাওয়ার বৃষ্টির পূর্বাভাসকে আমলে নিয়ে যদি খালের মধ্যে থাকা ১১টি বাঁধ কেটে দেওয়া হতো তাহলে গত মঙ্গল ও বুধবারের বৃষ্টিতে ডুবতো না চট্টগ্রাম মহানগরের অনেক এলাকা। আর চট্টগ্রামবাসীকেও ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। এই দায়ভার কি প্রকৌশলীদের, না আবহাওয়ার পূর্বাভাসের?

এখন প্রশ্ন গত মঙ্গল ও বুধবারের বৃষ্টির বিষয় কি আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দেয়নি? কিংবা বৈশাখ মাসে যে আগাম এক বা দুই দফা বৃষ্টি হয় সেই ধারণা কি প্রকৌশলীদের নেই? ২০২৪ সালের ৬ মে তারিখের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেট মোড় থেকে মুরাদপুর মোড় পর্যন্ত এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল। এর আগে ২০২৩ সালে বৈশাখে বৃষ্টি না হওয়ায় প্রাক-বর্ষায় নগরীতে জলাবদ্ধতা হয়নি। গত বছরও বৈশাখে বৃষ্টি না হওয়ায় এপ্রিল মে মাসে জলাবদ্ধতার দেখা পায়নি নগরবাসী। তাহলে কি জলাবদ্ধতা নিয়ে বাজি খেলেছেন প্রকৌশলীরা?

আবহাওয়া অধিদপ্তরের অন্যতম বিশেষজ্ঞ আবহাওয়াবিদ ড. বজলুল রশিদ। দেশের ৪৬ বছরের উপাত্ত নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে প্রতি বছর বৈশাখে বৃষ্টি হয়। এ বছর সারা দেশে গড়ে ৩০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে এপ্রিলে। কিন্তু চট্টগ্রামে যে ভারী বৃষ্টি হবে তা তো আমরা পূর্বাভাসে বলেছি। এখন আমাদের পূর্বাভাস যদি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আমলে না নেয়, এর দায় তো আমাদের না।

প্রকৌশলীরা কি বাজি খেলেছে : যেখানে ২০২৪ সালের বৈশাখের বৃষ্টিতে পানি জমেছে এবং এর আগেও বৈশাখের বৃষ্টিতে পানি জমার রেকর্ড রয়েছে। তাহলে এবার কেন তারা খালগুলো কেটে দেয়নি? এর আগে কয়েক দফায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজে খালের মধ্যে থাকা বাঁধগুলো ১৫ মে পর্যন্ত থাকবে। এরপরই তারা বাঁধ কেটে দেবে।

১৫ মে’র আগে যে বৃষ্টি হবে তা প্রকৌশলীদের জানার কথা। তারা বৃষ্টিতে সৃষ্ট দুর্ভোগ লাঘবের ব্যবস্থা নেয়নি কেন? এ বিষয়ে জলাবদ্ধতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানান, সবাই জানত বৈশাখে একটি বৃষ্টি হবে। কিন্তু সেই বৃষ্টি যে এত বেশি হবে তা কারও ধারণায় ছিল না। ২০২৫-এ যেহেতু আগাম বৃষ্টি হয়নি, তাই এবার হলেও হয়তো বেশি হবে না। এমন একটা ধারণা ছিল সবার মধ্যে। এ ধারণা করতেই গিয়েই দুর্ভোগে পড়তে হলো। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয় জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীরা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি, অথবা আবহাওয়ার পূর্বাভাস ক্লিয়ার ছিল না। পাশাপাশি কম সময়ে বেশি বৃষ্টির বিষয়টিও ভুগিয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৈশাখে বৃষ্টি হবে তা আমাদের ধারণায় ছিল। কিন্তু এত বেশি হবে তা অনুধাবন করিনি।’

বৃষ্টি কি বেশি হয়েছিল : আবহাওয়া অধিদপ্তরের থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরেরর ভেতরে থাকা বৃষ্টিমাপক যন্ত্র (আমবাগান অফিসে) গত ২৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৭৫ মিলিমিটার এবং পতেঙ্গা কার্যালয়ে ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। মূলত এই তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ডুবেছে পুরো নগরী। অন্যদিকে ২৯ ডিসেম্বর বুধবার আমবাগানে দুপুর ১২ থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টি এবং পতেঙ্গায় রেকর্ড হয়েছে ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টি। এখন প্রশ্ন হলো তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে প্রতি ঘণ্টায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে? এই বৃষ্টিতে নগরে পানি উঠবে কেন?

এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, আমাদের ডিজাইন কিন্তু ঘণ্টায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে রাস্তায় পানি জমবে না। তাহলে ডিজাইনে যদি ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি না হলে পানি উঠে, সেখানে ঘণ্টায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পানি উঠল কেন?

কোথায় কোথায় পানি উঠেছে : গত মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে নগরীর অনেক এলাকায় পানি জমলেও ভয়াবহতা ছিল প্রবর্তক মোড়, জামালখান, রহমতগঞ্জ, তিন পুলের মোড় প্রভৃতি এলাকায়। এসব এলাকায় বেশি পানি উঠেছে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, এসব এলাকার দুটি খালে (হিজরা খাল ও জামালখান খাল) ১১টি বাঁধ দিয়ে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল। খালের পানি অপসারণের জন্য বিকল্প একই বাইপাস থাকলেও সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি যাওয়ার মতো ব্যবস্থা ছিল না। এসব বাঁধের কারণে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারেনি। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য জলাবদ্ধতা মারাত্মক রূপ নেয়।

এখন কি জলাবদ্ধতার কাজ চলবে : আগামী ১৫ পর্যন্ত সময় পাওয়া গেলে জলাবদ্ধতার কাজ শেষ হয়ে যেত বলে প্রকল্প পরিচালকের দাবি ছিল। কিন্তু গত মঙ্গল ও বুধবারের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ তৈরি হওয়ায় জলাবদ্ধতার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বর্ষার আগে আর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কোনো কাজ হবে না। এখন খালের মধ্যে থাকা সব বাঁধ কেটে দিতে হবে এবং খালের মাটি অপসারণ করে খালগুলোকে পানি চলাচলের উপযোগী করে দিতে হবে।’

বাঁধগুলো কাটতে কী পরিমাণ সময় লাগতে পারে জানতে চাইলে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘আশা করছি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমরা খালের সব বাঁধ অপসারণের পাশাপাশি খাল থেকে মাটি তুলে নিতে পারব। আর তা করা গেলে এবারের বর্ষায় ভালো সুফল পাওয়া যাবে।’

 

আসন্ন বর্ষায় সুফলের আশাবাদ : বৈশাখের বৃষ্টিতে নগরী জলমগ্ন হলেও বর্ষায় নগরীতে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ কম হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, গত বছরের বর্ষায় যেমনিভাবে আমরা জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিয়ে এনেছিলাম। এবার আরও উন্নতি হবে এবং নগরবাসী জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ আরও কম পাবে বলে আশা করছি।

সিটি মেয়রের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, গত এক বছরে অনেক কাজ হয়েছে। আর এতে বলা যায়, গত বছর আমরা যে সুফল পেয়েছি, এবার আরও বেশি সুফল পাব।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯ সদস্যের কমিটি : জলাবদ্ধতা সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রকে আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহীকে সদস্যসচিব করে ১৯ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-২ শাখার উপসচিব আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত গতকালের এই কমিটির অপর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড কোরের ব্রিগেড কমান্ডার, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন), জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন শাখার একজন উপসচিব, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক), ৩৪ ব্রিগেড কমান্ডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক, সিডিএর সদস্য (প্রকৌশল), চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চসিকের সচিব, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী, চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা, চসিকের জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার খালেদ, চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ হাইডোগ্রাফার, পিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক (সিডিএ), কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির একজন মহাব্যবস্থাপক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জলমগ্নতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্প রয়েছে।  অন্যদিকে সিডিএ’র ২ হাজার ৭৭৯ কোটির প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণের আওতায় ১২টি সøুইসগেট রয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি সøুইসগেট রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০টি সøুইসগেটে নগরীর খালগুলো থেকে কর্ণফুলী থেকে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ার কথা। সরকারের পক্ষ থেকে গত বছর থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প শেষ হলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সুফল পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্য। তবে বাস্তবতা বলছে বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হচ্ছে নগরী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত