কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আমাদের যতটা জানা, ব্যক্তি ওয়ালীউল্লাহ ততটাই অজানা-অচেনা। লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো যেভাবে পাঠকের মন জয় করেছে, সেভাবে ব্যক্তি ওয়ালীউল্লাহ আমাদের কাছে উন্মোচিত হননি। মানব জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রকাশ। এই আত্মপ্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অম্লান দত্ত তার এক লেখায় (শিল্পচিন্তা) বলেছিলেন, ‘আত্মপ্রকাশের জৈব উদ্দেশ্য এই, এতে কাজ হয়, অন্তত কাজ হবে বলে প্রত্যাশা থাকে। আমরা যখন উদ্বিগ্ন হয়ে কিছু বলি তখন তাতে সাহায্যের প্রত্যাশা থাকে, হয়তো সাহায্য পাওয়া যায়। আমার ছেলেটি হারিয়ে গেছে, এ কথা বলার পর প্রত্যাশা থাকে যে, আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশীরা আমাকে সাহায্য করবে ছেলেটিকে খুঁজে বের করতে, সাধারণত এই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজও হয়।’
মাহমুদ শাহ কোরেশীর প্যারিসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ বইটি সেই আত্মপ্রকাশেরই শক্তি। আত্মজৈবনিক গদ্যের মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রবাসজীবন, ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা ব্যক্ত করলেও, তার ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর টুকরো টুকরো স্মৃতি। ওয়ালীউল্লাহর পাঠকমাত্রই ওয়াকিবহাল তার প্যারিসের জীবন সম্পর্কে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে একজন শিল্পীর জীবন ও তার কর্মের প্রতি জিজ্ঞাসু পাঠকের যে কৌতূহল—সেখানে অপূর্ণতা রয়েছে। কারণটা পাঠকের সঙ্গে তার রচনাবলির পরিচয় ঘটলেও, ব্যক্তি ওয়ালীউল্লাহর উহ্য থাকা। মাহমুদ শাহ কোরেশীর আত্মজৈবনিক বইটিতে চার পর্বে সাতষট্টিটি গদ্যের মাধ্যমে সেই অপূর্ণতায় কিছুটা প্রাপ্তি যোগ হয়।
কীভাবে, সে প্রশ্নের উত্তরে আমরা গ্রন্থভুক্ত কয়েকটি শিরোনামের দিকে নজর দিতে পারি—সপরিবারে প্যারিস আগমন; আঁরা চাঁটগাঁইয়া নওজোয়ান, সৈয়দের প্রথমপত্র ও আমার আমেরিকা ভ্রমণ; ইউনেস্কোর অনুবাদ প্রসঙ্গ; চাঁদের অমাবস্যা শিরোনাম নির্ধারণে আমার সামান্য সাহায্য; প্যারিসে বাংলা পঠন-পাঠনের সূত্রপাত : সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত সৈয়দ; প্যারিসে আমার ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ, সৈয়দের অভিনন্দন; থিসিসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; সৈয়দের নিমন্ত্রণে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ফরাসি গবেষক; সৈয়দের নিজের বাড়ি; সৈয়দের ইউনেস্কোর কর্মজীবন; হাশেম ভাইয়ের বাসায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও রশীদ চৌধুরী; সৈয়দের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন; সৈয়দের স্বদেশ ভ্রমণ ১৯৬৯, ১৯৭০; ইউনেস্কোর চাকরি বিপর্যয়; মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অংশগ্রহণ ইত্যাদি।
এ ছাড়া গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশে ওয়ালীউল্লাহর বন্ধুভাগ্যসহ বিভিন্নজনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নানা স্মৃতি। যা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে পাঠককে কৌতূহলী করে তুলতে সহায়ক।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লিখেছেন খুবই কম। তার নিজের লেখালেখি সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক এক বক্তব্য পাওয়া যায় মাহমুদ শাহ কোরেশীর লেখায়। এক্ষেত্রে ‘সৈয়দের স্বদেশ ভ্রমণ : ১৯৬৯,১৯৭০’ অংশ থেকে উদ্ধৃত করি। ‘তিনি দেশে আসার পর চট্টগ্রাম শহরে তার ও তার স্ত্রীর সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনায় বলেন যে, তিনি যদি দেশে অবস্থানের সৌভাগ্য লাভ করতেন তাহলে তিনি তার লেখার প্রতিও অধিকতর সুবিচার করতে পারতেন।’ তার এই বক্তব্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছন্দ ভাবনার জগৎকে যেমন সম্প্রসারিত করে তেমনি একজন লেখকের অতৃপ্তি বোধেরও সন্ধান দেয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ এখনো প্রণীত হয়নি। সেই অভাব পূরণের পথে অনেকটাই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে মাহমুদ শাহ কোরেশীর এই বইটি। যদিও বইটি মাহমুদ শাহ কোরেশীর আত্মজৈবনিক রচনার অংশবিশেষ, কিন্তু ব্যক্তি মাহমুদ শাহ কোরেশীর সঙ্গে সঙ্গে এই বইয়ে উঠে এসেছে অনালোচিত ও অনাবিষ্কৃত ব্যক্তি ওয়ালীউল্লাহ। যেখানে মাহমুদ শাহ নিজের জীবনের উপকরণ থেকে নানা ঘটনা সংগ্রহ করে তার প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ওয়ালীউল্লাহর চিন্তা-চেতনা এবং ভাবনার গতি-প্রকৃতির খোঁজও অনেকটাই দিয়েছেন, যা ব্যক্তি ওয়ালীউল্লাহ চর্চারও আভাস দেয়।
