দিদির তৃণমূল না মোদির বিজেপি!

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৫:১৭ এএম

বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে ভারতের রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যটির ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ভোট হয়েছে দুই দফায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা শেষে আজ সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে। তবে এই ফল শুধু রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে কে বসবেন, তা নির্ধারণ করবে না, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চলমান মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের সামগ্রিক রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, এই ফল সেটির একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমন আভাস দেওয়া হয়েছে। এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে নজিরবিহীন ২ হাজার ১০০ কোম্পানিরও বেশি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। নির্বাচন মূলত শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং ভোট পড়েছে রেকর্ড ৯২ শতাংশেরও বেশি, যা সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়নি।

নির্বাচনী প্রচারে এবার এক অভাবনীয় উত্তেজনা লক্ষ করা গেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন বা স্পেশাল ইনসিভ রিভিশন (এসআইআর) এবং নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ সবকিছুই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। এর পাশাপাশি ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের পর কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, সুশাসন, নারী নিরাপত্তা এবং ক্ষমতাসীন-বিরোধী হাওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। তবে এই নির্বাচনের ফল যা-ই হোক না কেন, তা কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ওপর একটি রায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। এর মাধ্যমে বিজেপির তথাকথিত ‘শেষ দুর্গ’ জয়ের সক্ষমতা, ভারতের আঞ্চলিক বিরোধী দলগুলোর শক্তি এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক মেরূকরণের স্থায়িত্বের এক গভীর পরীক্ষা হবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান মূলত কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দলটির ক্ষমতায় আসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন বিজেপি দেশের অন্যান্য প্রান্তে ঝড় তুলেছিল, তখন বাংলায় তারা মাত্র ২টি আসন পায়। তবে সেবার তাদের ভোটের হার ২০০৯ সালের ৬ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১৬.৮৪ শতাংশ হয়েছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটির ঝুলিতে আসে ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসন এবং ভোটের হার একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪০.২৫ শতাংশ। এটি ছিল এক বিশাল উল্লম্ফন। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে জয়লাভের অর্থ হবে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, যা তারা ২০২১ সালে করতে পারেনি। ২০২১ সালে তৃণমূল ২১৩টি আসন পেয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপি বাংলায় মাত্র ১২টি আসন পায় এবং তাদের ভোটের হার কমে ৩৯.১০ শতাংশে দাঁড়ায়।

পশ্চিমবঙ্গ কেবল ভারতের একটি বড় রাজ্যই নয়; এটি পূর্ব ভারতে বিজেপির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে এক অন্যতম প্রধান প্রতিরোধ। তাই এই রাজ্যের এক বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। এখানে জিতলে উত্তর প্রদেশের পূর্ব প্রান্তেও বিজেপির গেরুয়া মানচিত্রের বিস্তার সম্পূর্ণ হবে। এর ফলে জাতীয় স্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভারতের আঞ্চলিক বিরোধী শিবিরের অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য মুখ। তিনি লড়াকু, নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রমাণিত এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটে কেবল নিজের শর্তেই যোগ দিতে রাজি। নিজের রাজ্যে পরাজয় তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটাবে না ঠিকই, তবে তা তাকে বিজেপি-বিরোধী জোটের অন্যতম মূল কারিগরের পরিবর্তে কেবল একজন টিকে থাকা নেতায় পরিণত করবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রবেশের পথ তৈরি হয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে যেমন সিএএ, এতে বিজেপি নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে; শিলিগুড়ি করিডরে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত পাহারা কঠোর করা এবং অনুপ্রবেশ বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু ভোট একীভূত করা। এই নির্বাচনে জয়ী হলে বিজেপির এই রাজনৈতিক এজেন্ডাটি বৈধতা পাবে এবং আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যেও, বিশেষ করে যেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বেশি এবং সীমান্ত অরক্ষিত সেখানে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

তৃণমূল যদি ক্ষমতা ধরে রাখে : এই নির্বাচনে তৃণমূলের জয়, এমনকি যদি তাদের আসন সংখ্যা আগের চেয়ে কমেও যায়, তাও এক গভীর বার্তা দেবে। এটি প্রমাণ করবে যে, সুদৃঢ় কল্যাণমূলক নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমে বিজেপির মতো শক্তিশালী সাংগঠনিক ও অর্থবল সম্পন্ন দলকেও আটকে দেওয়া সম্ভব। তৃণমূলের জয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকেও আরও উজ্জ্বল করবে। বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গে তাদের সব শীর্ষ নেতৃত্বকে মাঠে নামিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অন্তত ১৬ জন মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের এক বিশাল বহর প্রচার চালিয়েছেন। এর বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হলে তিনি কেবল তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধেই জয় দাবি করবেন না, বরং ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠান তার সরকারকে দুর্বল করার যে ‘ষড়যন্ত্র’ করেছে বলে তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন সেটিরও এক জুতসই জবাব দিতে পারবেন।

২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং বিজেপির দখলে ছিল ৭৭টি আসন। বেশিরভাগ বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) এবার বিজেপির এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে অন্তত দুটি জরিপ তৃণমূলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে ২০২১ ও ২০২৪ সালের মতোই বুথফেরত জরিপের ফলাফল প্রায়শই ভুল প্রমাণিত হতে পারে। নির্বাচনের চূড়ান্ত সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন মমতার ভোট ব্যাংক আগের চেয়ে সংকুচিত হয়েছে। কর্মসংস্থানের আশায় থাকা যুবসমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি গ্রামীণ হিন্দু নারী ভোটারদের যে বিশাল সমর্থন মমতার দীর্ঘদিনের শক্তি ছিল, তাতে ক্ষমতাসীনবিরোধী হাওয়া, রাজ্যে সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং হিন্দু ভোট মেরূকরণের কারণে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর তৃণমূল যদি খুব সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়, তবে তা বিরোধী জোট এবং রাজ্যের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

আজকের নির্বাচনী ফল যে দিকেই যাক না কেন, তার সঙ্গে এমন একটি বিতর্ক জড়িয়ে থাকবে যা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ ভোটার, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের দাবি ছিল, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি একে অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এক শুদ্ধি অভিযান হিসেবে সমর্থন করেছে। বিজেপি যদি খুব সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়, তবে অনেকেই যুক্তি দেবেন যে এসআইআর-এর কারণেই তারা জয় পেয়েছে। এটি ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে এক জাতীয় বিতর্ক তৈরি করবে যার প্রভাব কেবল বাংলায় নয়, সমগ্র ভারতে পড়বে।

জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত চরিত্র রয়েছে, এখানে যেকোনো রাজনৈতিক ট্রেন্ড দেরিতে আসে কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী ও চরম রূপ নেয়; যেমনটা দেখা গেছে বামপন্থিদের ৩৪ বছরের শাসন কিংবা মমতার দীর্ঘকালের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে। আজকের ফল কেবল এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে শেষ করবে না; বরং এটি ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথও ঠিক করে দিতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত