সম্প্রতি ধর্মীয় বক্তা মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তিনি প্রথম স্ত্রীর সন্তান প্রসবকালীন সময়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি জায়েজ হলেও এটাকে অত্যন্ত অমানবিক বলছেন গবেষক আলেমরা।
বিয়ের ক্ষেত্রে কেবল বৈধতার বিষয়কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ইনসাফ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার মতো মৌলিক মানবিক দাবিগুলো অনেক সময় উপেক্ষিত হচ্ছে। পারিবারিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রথম স্ত্রীর মানসিক অবস্থার প্রতি যত্নশীল হওয়া ইসলামের অন্যতম একটি দিক।
কেবল ব্যক্তিগত সামর্থ্য থাকলেই একাধিক বিয়ে করা যাবে কি না, কিংবা এই প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে কীভাবে উপস্থাপিত হওয়া উচিত, তা নিয়ে চিন্তাশীল আলেমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।
শায়খ মুস্তাফিজ রাহমানী
তিনি এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে লিখেছেন, দ্বিতীয় বিয়ে সব সময় জায়েজ নয়, এটা নিয়ে সুযোগ সন্ধানীরা ভণ্ডামি করে। সাধারণ ভাইবোনদের বলছি, ইসলাম এতো কঠিন না, ওদের কারনে আপনারা আলেমদের ভুল বুঝবেন না। প্লিজ, কথাগুলো শুনুন।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, কিছু কিছু আলেম দ্বিতীয় বিয়ে করছেন অথবা সাধারণ মানুষ করছেন, এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। আসলে কিছু কিছু জায়গায় ধোঁকাবাজি হচ্ছে এবং কিছু কিছু জায়গায় ভুল মেসেজ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইসলামে যদিও একাধিক বিয়ে জায়েজ, এটা কিন্তু ম্যান্ডেটরি কোনো পার্ট না। চার বিয়ের কথা আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যাদের সামর্থ্য আছে তাদের জন্য। এরপরে কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, যদি ইনসাফ কায়েম করতে না পারো, যদি আশঙ্কা করো যে সবার মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, তাহলে একটা নিয়েই যথেষ্ট থাকো।
এখন কথা হচ্ছে, আপনি যে ফ্ল্যাটে থাকবেন প্রথম বউ নিয়ে, দ্বিতীয় বউকে কিন্তু তেমন ফ্ল্যাটই দিতে হবে। আপনি যে খাবার খাবেন দুপুর বেলায়, রাত্রে বেলায়, প্রথম বউয়ের সাথে যে রকম আপনি সময় যাপন করবেন, ঠিক পরবর্তী বউ দুই নাম্বার, তিন নাম্বার বা চার নাম্বারের সাথেও তেমন আচরণ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে অনেক মানুষকে স্ট্রাগল করতে হচ্ছে চরম লেভেলের এক বউ বাচ্চা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে, সেখানে আপনি একাধিক বিয়ে করছেন, এটা আপনার সামর্থ্য থাকলে আপনি করতে পারেন। এটা সোশ্যাল মাধ্যমে নিয়ে এসে মানুষের সামনে যেভাবে উপস্থাপন করছেন, শরিয়াহ মনে হয় শুধু এই দ্বিতীয় বিয়েই, শরিয়াহ মনে হয় তিনটা বিয়ে।
যেসব অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে জানতে স্টাডি করছে অথবা নতুন করে দ্বীনে ফিরতে চাচ্ছে তাদেরকে আপনারা কি মেসেজটা দিচ্ছেন? দ্বিতীয় বিয়ে করলেই আপনি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন, তৃতীয় বিয়ে করলেই গুনাহ থেকে বেঁচে যাবেন, এটা আসলে ব্যাপারটা এরকম না। এটা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। বড় বড় শায়খুল হাদিস, মুহাদ্দিস, ওলামায়ে কেরাম, সালাফে সালেহিন তারা কি একটা বউ নিয়ে জীবন যাপন করেনি?
স্ত্রী প্রেগনেন্ট, এমতাবস্থায় যেখানে আপনি তাকে সহানুভূতি জানাবেন, যেখানে আপনি বাচ্চার জন্য মুখিয়ে থাকবেন সেখানে এত ‘এশক’ আপনার কোথা থেকে আসে? শরিয়তে যদিও বৈধতা দেওয়া হয়েছে একাধিক বিয়েকে, কিন্তু সোশ্যাল মাধ্যমে যেভাবে হাইলাইট করা হচ্ছে এবং আপনারা যে এজেন্ডা নিয়ে কাজ করতেছেন, বিষয়টা কেমন?
সোশ্যাল মাধ্যমের এই জামানায় যদি পাবলিক পালস আপনি বুঝতে না পারেন, এই যে আপনি একাধিক বিয়ে করছেন এটাতে দ্বীনের বিশাল বড় কি বিজয় হয়ে গেছে? আরে ভাই, আপনার প্রয়োজন থাকলে আপনি করেন না, কিন্তু এভাবে মিডিয়ায় ফোকাস করা, গৰ্ব্বের সাথে বলা, এর চেয়ে আরো প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় আছে, সেই বিষয়গুলো কেন আপনারা ফোকাসে নিয়ে আসেন না?
যে ইনসাফের কথা কোরআন হাদিসে বলা হয়েছে, সেই ইনসাফ বাংলাদেশের যারা একাধিক বিয়ে করেছেন সবাই কি করতে পারছেন? না করতে পারার পরেও তিন নাম্বার বিয়ে অনেকে করছেন। করছেন না? তাহলে এটার জবাব কি?
শায়খ আবদুল্লাহ আল মাসউদ
তিনি এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, আমার ছেলের যখন জন্ম হয়, আমি তার মায়ের পাশে ছিলাম। নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল। ফলে প্রসবের আগে তাকে প্রচুর কষ্ট আর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। সেটা দেখে আমার ভেতরটা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছিল। কখনো কখনো চোখে পানিও চলে এসেছিল। সেই সময় আমার দুটি অনুভূতি হয়েছিল। প্রথমটি হলো, অন্তত এই কষ্ট ভোগের কারণে হলেও আগামী দিনগুলোতে তার সব ত্রুটি ইগনোর করা উচিত। কখনো কোনো কিছু নিয়ে রাগ করা ঠিক হবে না। কারণ এই প্রচণ্ড ব্যাথা-বেদনা আর কষ্টের সামনে তার ভুল-ত্রুটি কিছুই না আসলে।
দ্বিতীয়টা হলো, প্রত্যেক বাবারই উচিত সম্ভব হলে সন্তান জন্মের সময়টাতে স্ত্রীর পাশে থাকা। তার কষ্টগুলো অনুভব করা। এটা পরবর্তী জীবনে অন্য রকম বোধের জন্ম দিবে। যাইহোক, কেউ তার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের আগে আগে আরেক বিয়ে করতে চাইলে আমার বারবার শুধু আমার ছেলের জন্ম-সময়ের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। কারণ একজন মা আসলে একসাথে ঠিক কতগুলো কষ্ট সইবার ক্ষমতা রাখে?
উল্লেখ্য যে, যেদিন কারো বাবা মারা যায়, সেদিন তাকে দাফন করে এসে বন্ধুবান্ধবদেরকে নিয়ে হৈহুল্লোড় করে বারবিকিউ পার্টি করা শরিয়তে নিষেধ নয়। এটা তাদের জন্য বললাম, যারা শরিয়তের জায়েজ-নাজায়েজের বাইরে আরও কিছু বিষয় যে লক্ষণীয় থাকে সেটা মানতে নারাজ।
