দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অচলাবস্থা নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন পর্যালোচনা করছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, সব ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সমঝোতা হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া জানিয়েছে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরান ধাপে ধাপে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষই প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তার জন্য ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, মূলত সৌদি আরব তাদের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিতে রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প এই পরিকল্পনা স্থগিত করেন। এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। আরাগচির অফিশিয়াল টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানা গেছে। সেখানে আরাগচি বলেছেন, ফোনালাপে তারা ‘সংলাপ ও কূটনীতি’ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘দ্রুত সাড়া’ প্রত্যাশা করছেন। বর্তমানে আলোচনা চলমান এবং যেকোনো সময় চূড়ান্ত সমঝোতা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে মাত্র এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি রয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সম্মত হবে। এর পাশাপাশি দুই দেশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেবে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান-ইরান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়াকে পাকিস্তানি সূত্রটি আরও জানায়, ইরানি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই এই প্রক্রিয়া চলছে।
হরমুজ প্রণালিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের পেছনে মিত্র দেশ সৌদি আরবের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয়। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার বরাতে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে রবিবার বিকেলে সামাজিকমাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প উপসাগরীয় মিত্রদের বিস্মিত করেন, যা সৌদি আরবের নেতৃত্বকে ক্ষুব্ধ করে। এর জবাবে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে জানায়, তারা রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান উড্ডয়ন করতে দেবে না এবং এই উদ্যোগে সহায়তার জন্য সৌদির আকাশসীমাও ব্যবহার করতে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ফোনালাপেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ আকাশসীমায় আবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টকে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করতে হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এ ঘটনায় বিস্মিত হয়েছিল। কারণ, এই উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প কাতারের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। এক সৌদি সূত্র এনবিসি নিউজকে জানায়, ট্রাম্প ও যুবরাজ নিয়মিত যোগাযোগে ছিলেন। সূত্রটি আরও জানায়, সৌদি কর্মকর্তারা ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছিলেন। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণায় সৌদি নেতৃত্ব বিস্মিত হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সৌদি সূত্রটি বলে, সমস্যা হলো, ঘটনাগুলো বাস্তব সময়ে খুব দ্রুত ঘটছে। সূত্রটি আরও জানায়, যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি করতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সৌদি আরব সমর্থন করছে।
