কারাগারে বিপন্ন শৈশব

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৮:১৯ এএম

হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফাঁসির রায় হয় ফেনীর সোনাগাজীর কামরুন নাহার মনির (তখন তার বয়স ১৯ বছর)। এক মাসের কম বয়সী দুগ্ধপোষ্য কন্যাশিশুকে নিয়ে তিনি কারাবাসে যান। মনি এখন গাজীপুর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে (প্রচলিত ভাষায় কনডেম সেল) বন্দি। অধস্তন আদালতের রায়ের ছয় বছরের বেশি সময় পার হলেও তার মামলাটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হয়নি। ছয় বছর ফাঁসির সেলে তার সঙ্গে রয়েছে শিশুটি। ইতিমধ্যে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে মনির। পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুটি মায়ের সঙ্গে বড় হচ্ছে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে।

বাংলাদেশে ফাঁসির আসামিদের জামিনের রেওয়াজ নেই। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতেও লেগে যায় কমপক্ষে পাঁচ বছর থেকে দুই যুগ পর্যন্ত। অন্যদিকে প্রায়শই অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলায় শিশুসহ মায়েদের জামিন না-মঞ্জুর হচ্ছে। তাদের কেউ কারাগারে ডিভিশন বা বাড়তি সুবিধা পান না। ফৌজদারি আইনে নারীদের জামিন বিষয়ে বিবেচনার সুযোগ আছে। অন্যদিকে লঘু অপরাধে বিকল্প কারাবাসের (প্রবেশন) বিধান থাকলেও এর চর্চা ও প্রয়োগ কম। ফলে মায়েদের সঙ্গে শিশুরাও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একপ্রকার কারাবাসই করে।

বাংলাদেশ কারাবিধির (বাংলাদেশ জেল কোড) ৯৫৭ বিধি অনুযায়ী, নারী হাজতি ও কয়েদিরা চার বছর পর্যন্ত তাদের সন্তানদের কাছে রাখতে পারেন। তবে, আইনে বলা আছে, কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছয় বছর পর্যন্ত সন্তানদের কাছে রাখার সুযোগ মেলে। কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শিশুর বয়স ছয় বছর পার হলে এবং মা কারাগারে থাকলে যে শিশুর স্বজনরা তাদের নিতে চান তাদের স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। আর যেসব শিশুর স্বজন থাকে না তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাঠানো হয় সরকারি শিশুনিবাসে।

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত আসামি মনির মা (শিশুটির নানি) নুর নাহার (৫৫) মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, পারিবারিক সম্পদ যা ছিল তা মামলার খরচে প্রায় শেষ। এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে সুদে টাকা ধার করে মামলা চালাচ্ছেন। নাতনির জন্য কিছুই রাখতে পারেননি। অর্থাভাবে তাকে নিয়মিত দেখতে যেতেও পারেন না। সবশেষ নাতনিকে দেখে গিয়েছেন গত ঈদুল ফিতরের পরের দিন (২২ মার্চ)। তিনি বলেন, ‘বাইরের পরিবেশটা কি নাতনি এখনো জানে না। ওখানে মা আছে। আরেকজন আসামিকে (তিনিও ফাঁসির আসামি) ‘ছোট মা’ ডাকে। তারাই আদর-যত্ন করে। কিন্তু পোলাপানের মন কি আর মানে! জেলেও কষ্ট করছে, বাইরে এলেও কষ্ট করবে।’  

কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ওই শিশুসহ ২৯৯ শিশু (২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) রয়েছে মায়েদের সঙ্গে। এসব শিশুর মায়েদের বেশিরভাগ মাদক মামলার আসামি। এর মধ্যে কন্যাশিশু ১৫৩ জন। আর ছেলেশিশু ১৪৬ জন। এই শিশুদের মায়েরা কেউ সাজা খাটছেন, কারও মামলা রয়েছে বিচারের পর্যায়ে। সম্প্রতি কারা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ১৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে শিশু রয়েছে ১০০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে রয়েছে ৯০ শিশু। রাজশাহী বিভাগের ৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে রয়েছে ২৫ শিশু। সিলেট বিভাগের ৫টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে রয়েছে ১৯ শিশু। এছাড়া রংপুরে ৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২৫ জন, খুলনা বিভাগের ১০টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২০ জন, বরিশাল বিভাগের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে (মোট ৬টি কারাগার) ৪ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে আছে ১৩ জন শিশু। মায়েদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শিশু রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে। গত ৪ মে পর্যন্ত ওই কারাগারে ৫১ শিশু রয়েছে। এর মধ্যে ছেলেশিশু ২৪ ও কন্যাশিশু ২৭ জন। এই শিশুদের প্রায় সবাইকে থাকতে হয় কারাগারের নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা সেলে, যেখানে অন্য সাজাপ্রাপ্ত বা হাজতিরা থাকেন। যাদের বেশিরভাগ হত্যা ও মাদক মামলার আসামি।

বিশ্লেষকরা বলেন, দেশের কারাগারগুলো এখনো সংশোধন কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে কিছু সুবিধা থাকলেও জেলা কারাগারে সেটি নেই। সেখানে নেই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। নেই যথাযথ শিক্ষা, খেলা ও বিনোদনের সু-ব্যবস্থা। উপরন্তু কতিপয় চিহ্নিত আসামি ও পেশাদার অপরাধীর সংস্পর্শে আসছে শিশুরা। কারাগারগুলোতে শিশুদের মনোজগতের ঘাটতি পূরণে কাউন্সেলিংয়েরও কোনো সুবিধা নেই।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারা অধিদপ্তর ও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার সংশ্লিষ্ট অন্তত ৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাগারগুলোতে গত কয়েক বছর ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি থাকেন। বেশিরভাগ মাদক মামলার আসামি। যেসব নারী বন্দি আছেন তাদেরও বেশিরভাগ মাদক মামলায় অভিযুক্ত। আর মায়েদের সঙ্গে শিশুর সংখ্যাও কয়েক বছর ধরে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মধ্যে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কিছু সুযোগ-সুবিধা আছে। কিন্তু জেলা কারাগারে সে সুবিধা নেই।  

কারা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য মতে, সকাল ৭টার দিকে নাস্তা সেরে শিশুরা সেল বা ওয়ার্ড থেকে বেরোতে পারে। এরপর একটু পড়া, খেলা, দুপুরের খাবার, বিকেলে খেলাধুলা, এবং সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেলে ফিরে যাওয়া। এই তাদের দিনলিপি। কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোর ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে। সেখানে শিশুরা নানা ধরনের খেলনা নিয়ে খেলতে পারে। শিশুদের জন্য আলাদা রান্না হয়। সকালের নাস্তায় বয়সভেদে রুটি, ডিম, দুধ বা সবজি, সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে দুপুরে ও রাতের খাবারে মাংস, মাছ খেতে দেওয়া হয়। পুষ্টির ঘাটতি পূরণে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়া হয় দুধ, কলা ও ডিম। চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা। দুগ্ধপোষ্য শিশুদের দেওয়া হয় দুধ। কারা কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের ব্যবস্থা নেই। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে শিশুদের একত্র করে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেখানো হয়। বেশিরভাগ কারাগারে শিক্ষক নেই। যেসব বন্দিরা একটু শিক্ষিত তারাই সেখানে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। আর শিশুরা অসুস্থ হলে নানা বিপত্তি পেরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের নারী বন্দি ও তাদের সঙ্গে থাকা শিশুদের দেখভালে নিযুক্ত আছেন চিকিৎসকসহ ৭ জন কর্মকর্তা। এ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোছা. কাওয়ালিন নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুগ্ধপোষ্য শিশুরা সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গেই থাকে। অন্য শিশুরা খেলা ও পড়ার সুযোগ পায়। তাদের জন্য কারা শিক্ষক রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে আমরা সব সময় নজর দিয়ে থাকি।’   

কারা অধিপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাতুল- উল ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে জানান, শিশুদের বিষয়টি স্পর্শকাতর। তাই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। প্রতিটি কারাগারেই শিক্ষকের পদ আছে। কিন্তু নানা কারণেই অনেকে চাকরি ছেড়ে চলে যান। খাবারের বিষয়টিও নিয়মিত দেখভাল করা হয়। তিনি বলেন, ‘শিশুদের সুস্থতা ও পুষ্টির বিষয়টিকে আমাদের প্রাধান্য দিতে হয়। তাই আইন ও বিধির মধ্যে শিশুদের যতটুকু করা যায় ততটুকুই আমরা করতে পারি।’

বিকল্প কি কিছুই নেই? 

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও শিশুর জামিন বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ১৯৬১ সালের দ্য প্রবেশন অফেন্ডার্স অ্যাক্টেও লঘু অপরাধে কারও সাজা হলে শর্তসাপেক্ষে আসামিকে কারাগারে না পাঠিয়ে সমাজসেবা অফিসারের মাধ্যমে প্রবেশনে অর্থাৎ নিজ বাড়িতে রেখে সাজা কার্যকরের বিধান রয়েছে। আইন বিশ্লেষকরা বলেন, এই চর্চা এখনো নিয়মিত হয়ে ওঠেনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এতগুলো শিশুর কারাগারে থাকা আমাদের আইনি কাঠামো ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক গভীর প্রশ্ন। শুধুমাত্র মায়ের অপরাধের কারণে শিশুকে কারাগারে বেড়ে উঠতে বাধ্য করা কতটা ন্যায়সংগত, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের আইনে নারী, গর্ভবতী নারী ও শিশুসন্তানের মায়েদের জামিন বিবেচনায় কিছুটা সহানুভূতিশীল হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আইনগত সুবিধাগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই।’ ইশরাত হাসান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান বা পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাব আদালতকে অনেক সময় প্রবেশন বা জামিন দিতে নিরুৎসাহিত করে। আর এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই শিশুগুলো।’

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মায়ের সঙ্গে দুগ্ধপোষ্য শিশু থাকবে। শিশু ছয় বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে, এটা প্রচলিত নিয়ম। এর বাইরে  আপাতত সুযোগ নেই। তবে, সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, ‘চাইলে কিছু মামলার ক্ষেত্রে জামিনের সুযোগ থাকলে, দিয়ে দিতে হয়। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো যারা অপরাধে আইনের আওতায় আসেন তাদের বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হওয়া যায়।’ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কারাগারগুলোর পরিবেশ উন্নত করার পরামর্শও দেন এস এম শাহজাহান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত