সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উপকূলে আবার জলদস্যুদের উৎপাত শুরু হয়েছে। যারা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিল, তাদের অনেকেই আবার দস্যুপনায় ফিরে এসেছে। এতে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে নতুন করে দেখা দিয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আতঙ্ক। একসময় সুন্দরবনে বাঘের চেয়ে বেশি ভয়ের কারণ ছিল শীর্ষ জলদস্যু মাস্টার, মজনু, ইলিয়াস, শান্ত ও আলম। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল আরও অন্তত দেড়শর বেশি জলদস্যু। তারা জেলে-মাঝি ও পর্যটকদের জিম্মি করে লুটে নিত সর্বস্ব। স্থানীয় প্রশাসনও তাদের তা-বে দিশেহারা ছিল। আবার তাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী মহলও হয় লাভবান। এসব জলদস্যু দস্যুপনায় ফিরে আসায় সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে।
২০১৬ সালে দলবল নিয়ে ৩২টি জলদস্যু বাহিনী র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বছর পাঁচেক ভালোই ছিল তারা। ভালো ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও। কিন্তু আর্থিক সুবিধা না পেয়ে অনেকেই আবার চলে যায় পুরনো কর্মযজ্ঞে! সুন্দরবনের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরেও চালাচ্ছে অপরাধ কর্মকা-। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জেলে-মাঝিসহ সাধারণ লোকজনের মাঝে। পুলিশ ও র্যাবের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ইতিমধ্যে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নির্দেশনানুযায়ী, দস্যুদের তালিকার কাজও শুরু হয়েছে। তারপরও থেমে নেই জলদস্যুদের তৎপরতা। জেলেরা প্রায়ই হামলা ও অপহরণের শিকার হচ্ছেন। আবার মুক্তিপণ দিয়েও মিলছে না রেহাই।
পুরনো ডেরায় ফেরার কারণ : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের একটি বড় অংশ স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিপত্তির মুখে পড়েছে। এর কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পর দস্যুদের অনেকেই সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা তাদের সন্দেহের চোখে দেখে। এতে তারা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। ফুরিয়ে গেছে সরকারের দেওয়া অনুদান, হয়নি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। এসব কারণে অনেকে ফের দস্যুতায় ফিরে আসে। অন্যদিকে দস্যুদের অস্ত্রের জোগান দেওয়া মহাজনরাও বেশি আয়ের লোভ দেখিয়ে আবার তাদের বনে পাঠাচ্ছে।
টাস্কফোর্স কার্যক্রম আছে থমকে : পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, অবৈধভাবে গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ না পেয়ে মানুষ হত্যা, ডাকাতি ও ট্রলার ছিনতাইসহ নানা অপরাধ করত জলদস্যু-বনদস্যুরা। দস্যুপনার মাধ্যমে অর্জিত অর্থের ভাগ যেত খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের প্রভাবশালীদের পকেটেও। ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে র্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে জলদস্যু দমনে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। র্যাবের অভিযানে ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। ওই সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ। আত্মসমর্পণের পর তাদের পুনর্বাসনে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অনুদানের পাশাপাশি ১০২টি ঘর, ৯০টি মুদি দোকান (মালামালসহ), ১২টি জাল ও মাছ ধরার নৌকা, ৮টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও গবাদিপশু দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর তারা কোনো সহায়তা পায়নি।
চিন্তায় পুলিশ-র্যাব : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, দস্যুরা আগের চেয়ে অধিক সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর। র্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘আগে দস্যুরা বড় বাহিনী নিয়ে নামত, এখন তারা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে। তাদের কাছে অত্যাধুনিক জিপিএস সিস্টেম ও স্যাটেলাইট ফোনও পাওয়া যাচ্ছে।’ সুন্দরবনের আশপাশে র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার টহল বাড়ানো হলেও দস্যুদের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে, অভিযানের খবর তারা আগেই পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী উপকূলীয় এলাকার দুর্গম চরাঞ্চলগুলো এখন দস্যুদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
দস্যুপনা কমছেই না : উপকূলীয় জেলেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাগরে বা বনে মাছ ধরতে গেলেই দস্যুদের কবলে পড়তে হচ্ছে। দস্যুরা এখন আর আগের মতো শুধু নৌকায় হামলা করে না, জেলেদের অপহরণও করছে। তারা খবর রাখে কোন মহাজন কতগুলো নৌকা সাগরে পাঠিয়েছে। অনেক সময় দস্যুরা সাধারণ জেলের বেশেও নৌকায় উঠে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। মোংলার ভুক্তভোগী জেলে রহমত আলী জানান, ‘আগে জানতাম বন দস্যুমুক্ত। কিন্তু এখন বনে গেলেই মনে হয় প্রতিটা ঝোপের আড়ালে কেউ বসে আছে। আমরা এখন বন বিভাগ বা কোস্টগার্ডের চেয়ে দস্যুদের ভয়েই বেশি তটস্থ থাকি।’
পণ দিয়েও মুক্তি মিলছে না : গত সোমবার সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলসংলগ্ন সুন্দরবনে জলদস্যুদের হাতে অপহরণের শিকার হন ২০ জেলে ও মৌয়াল। তাদের মধ্যে ১৮ জন সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে জেলে শুকুর আলী গাজী ও রেজাউল করিমের পরিবার ৩০ হাজার টাকা করে দিলেও এখনো তারা ফিরতে পারেননি। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ ও ৫ মে ‘আলিফ ওরফে আলিম বাহিনী’ ও ‘নানাভাই বাহিনী’র পরিচয়ে অস্ত্রধারী দস্যুরা চুনকুড়ি নদীর গোয়ালবুনিয়া দুনের মুখ, ধানোখালীর খাল, মামুন্দো নদীর মাধভাঙা খাল ও মালঞ্চ নদীর চালতে বেড়ের খাল এলাকা থেকে তারা অপহৃত হয়।
অপহৃতদের মধ্যে মুরশিদ আলম ৭০ হাজার, করিম শেখ এক লাখ ২০ হাজার, আবু ইসা ৫৫ হাজার, মমিন ফকির ৪৫ হাজার, আল-আমিন ২৫ হাজার, আবুল বাসার বাবু ৩০ হাজার, আবুল কালাম ৩০ হাজার, শাহাজান গাজী ৪০ হাজার, সিরাজ গাজী ৪০ হাজার, রবিউল ইসলাম বাবু ২০ হাজার, সঞ্জয় ২০ হাজার, আল-মামুন ২০ হাজার, হুমায়ুন ২০ হাজার, মনিরুল মোল্লা ২০ হাজার, রবিউল ইসলাম ২০ হাজার, হৃদয় মণ্ডল ২০ হাজার, আব্দুল সালাম ৪০ হাজার ও ইব্রাহীম গাজী ৫৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসেন। তবে জেলে শুকুর আলী গাজী ও রেজাউল করিম এখনো ফেরেনি। এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘জলদস্যু নির্মূলে কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে অপহৃতদের পরিবার বা সহযোগীরা বিস্তারিত তথ্য দিয়ে যথাযথ সহযোগিতা করছে না।
এদিকে আগে মুক্তিপণ দিয়ে রেহাই পেলেও বর্তমানে টাকা দেওয়ার পরও জেলেদের নির্যাতন চালানো হচ্ছে বা তাদের ট্রলারের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, অনেক সময় মুক্তিপণ পাওয়ার পর দস্যুরা অপহৃত জেলেকে অন্য কোনো ছোট গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। ফলে একবার অপহৃত হলে পরিবারকে একাধিকবার টাকা গুনতে হচ্ছে। টাকা দিতে না পারলে জেলেদের সাগরে ফেলে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে।
আত্মসমর্পণের পরও যারা দস্যুতায় : আত্মসমর্পণ করা দস্যু বাহিনীগুলো হচ্ছে মাস্টার, মজনু, ইলিয়াস, শান্ত, আলম, সাগর, খোকাবাবু, নোয়া, জাহাঙ্গীর, ছোট রাজু, আলিফ, কবিরাজ, মানজু, মজিদ, বড়ভাই (১), বড়ভাই (২), সুমন, ডন, ছোট জাহাঙ্গীর, ছোট সুমন, দাদা ভাই, হান্নান, আমির আলী, সূর্য, ছোট শামসু, মুন্না, আনোয়ারুল, তইয়ুব, সিদ্দিক, আল আমিন, সাত্তার ও শরীফ বাহিনী। তাদের মধ্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সাতটি করে এবং ২০১৮ সালে ১৮টিসহ মোট ৩২টি বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করে। এসব গ্রুপ আবার সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে দস্যুতা শুরু করেছে।
গোপন নোটে আছে যেসব তথ্য : পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি জলদস্যুদের নিয়ে করা পুলিশের বিশেষ ইউনিটের একটি প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দস্যুরা সাগরে আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা মিয়ানমার ও ভারতের দস্যুদের সঙ্গে যোগসাজশে অপরাধ সংঘটিত করছে। তারা জেলেদের ওপর হামলা চালিয়ে মাছ ও ট্রলার লুটে নিচ্ছে। জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণও আদায় করছে। তারা অপরাধ ঘটিয়ে মিয়ানমার সীমান্তে চলে যাচ্ছে। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। প্রভাবশালী চক্রগুলো প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা মূল্যের ইলিশসহ অন্যান্য সামুুদ্রিক মাছ পাচার করছে ভারত ও মিয়ানমারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উপকূলীয় এলাকায় অন্তত দেড়শ দস্যু গ্রুপ সক্রিয় আছে। তাদের কাছে আছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। তারা অপহরণ, নৌকা-জাহাজে ডাকাতি, জেলে-মৌয়ালদের থেকে মুক্তিপণ আদায়, কাঠ পাচার, হরিণ ও বাঘ শিকারের সঙ্গে জড়িত। বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি দুবৃর্ত্তরা সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কপিলমুনি, বড়শিয়ালা খাল, অরমলখাল, ভেরিখাল; খুলনা রেঞ্জের পাটাকাটা খাল, আলকি, নিশানখালী, ভোমরখালী, পাটকোস্টা; সাতক্ষীরা রেঞ্জের কালীরচর, পুষ্পকাটি, নোটাবেকি, হলদিবুনিয়া, মান্দারবাড়ি, কোপানচি; শরখোলা রেঞ্জের পাথুরিয়া, দুধমুখী, সুপতি ও শাপলা খাল এলাকাও অপরাধ সংঘটিত করছে।
বিশেষ বার্তা পুলিশ সদর দপ্তরের : পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পেছনে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে কাঠোর বার্তা জারি আছে। আত্মসমর্পণ করা কোনো জলদস্যু আগের কারবারে সক্রিয় হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। সুন্দরবনে এ মুহূর্তে ছোটখাটো দু-একজন দুষ্কৃতকারী থাকলেও তাদের প্রভাব বিস্তারের কোনো সক্ষমতা নেই। কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাবও কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করে একজন অপরাধ বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা ‘বীরদর্পে’ ফিরে আসা চপেটাঘাত। উপকূলীয় মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় জেলে-মৌয়ালদের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প হুমকির মুখে পড়বে।