‘... সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে/ রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি/ আম কুড়াবার ধুম।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে মোর রুদ্র, হে মোর তপ্ত/ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রবি
ঝলসিয়া দাও, শস্য-শ্যামল/ এই বাংলার রবি!
কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলা সনের দ্বিতীয় এবং গ্রীষ্মকালের অন্যতম প্রধান মাস জ্যৈষ্ঠ। এটি সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে, জুন মাসের মধ্যবর্তী পর্যন্ত থাকে। প্রচণ্ড গরমের কারণে ‘জ্যৈষ্ঠ’ মাস পরিচিতি পেলেও, মূলত এটি বাহারি ও রসাল ফলের জন্য জনপ্রিয়। ফলের মিষ্টি সুগন্ধ এবং পাকা ফলের স্বাদে মুখরিত থাকে বলে অনেকে একে ‘মধুমাস’ বলেন! আসলে যা একেবারেই ভুল। মূলত চৈত্র মাস হচ্ছে ‘মধুমাস’। কিন্তু এমন কথায় কেউ চমকে উঠতে পারেন। চৈত্র আবার কীভাবে ‘মধুমাস’ হয়! যদিও পাকা ফলের প্রাচুর্যের কারণে জ্যৈষ্ঠ মাস ‘মধুমাস’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, জামরুল, আনারস, তরমুজ, তালশাঁস, লটকন, গোলাপ জাম, আতাফল এমন বিভিন্ন ফলের গন্ধে বাতাস ম-ম করে। জ্যৈষ্ঠ মাস প্রকৃতিতে এক অনন্য আবেশ নিয়ে আসে। শুধু দাবদাহের মাস নয় জ্যৈষ্ঠ, এই মাস বাঙালির উৎসব ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সময়।
প্রখর রোদ ও গরমে এ সময় বেলি, গন্ধরাজ, ডুলিচাঁপা, কেয়া, কনকচূড়া, সোনালি শাপলা এবং মধুগন্ধি কইনার মতো সুগন্ধি ফুল ফোটে। জ্যোতিষ মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসে জন্মানো ব্যক্তিরা সাধারণত দীর্ঘদেহী, চিন্তাশীল এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে থাকেন। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় সময় নির্ধারণের বড় ভিত্তি ছিল নক্ষত্র। আকাশকে ২৭টি নক্ষত্রমণ্ডলে ভাগ করে চাঁদের চলাচল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সময় গণনা করা হতো। চাঁদ যখন নির্দিষ্ট কোনো নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করত, সেই সময়কালকে কেন্দ্র করে মাসের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই হিসাবে, সবগুলো বাংলা মাসের নামের সঙ্গে নির্দিষ্ট নক্ষত্রের সম্পর্ক রয়েছে। বৈশাখ যেমন এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে, তেমনি জ্যৈষ্ঠ এসেছে ‘জ্যেষ্ঠা’ নক্ষত্র থেকে।
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ দুই মাস মিলে গ্রীষ্মকাল। দৌলত উজির বাহরাম খান তার কাব্যে বলেছেন ‘মধুমাসে উতলা বাতাস, কুহরে পিক; যদি সে কমল শিশিরে দহল, কি করিব মধুমাসে।’ এখানে তিনি চৈত্র মাসের কথা বলেছেন। কারণ জ্যৈষ্ঠ মাসে কোকিল ডাকে না। প্রাচীন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চৈত্র মাস অর্থে ‘মধুমাস’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, ‘মধুমাসে মলয় মারুত মন্দ মন্দ/ মালতীর মধুকর পিয়ে মকরন্দ।’ এদিকে চণ্ডীদাস চৈত্র মাস বা বসন্তকাল অর্থে মধুমাস শব্দ ব্যবহার করেছেন, ‘মধুমাস আপায় মাধব পরশে’ এখানে আপায় মানে ‘গত হয়’। আবার খনার বচনে ‘মধুমাস’ বলতে চৈত্র মাসকেই বোঝানো হয়েছে। ‘মধুমাসে প্রথম দিনে হয় যেই বার/ রবি শোষে মঙ্গল বর্ষে, দুর্ভিক্ষ বুধবার।/ সোম শুক্র শুরু আর/ পৃথ্বী সয় না শস্যের ভার। / পাঁচ শনি পায় মীনে/ শকুনি মাংস না খায় ঘুণে।’ অভিধান মতে, ফাল্গুন ও চৈত্র মাস মিলে বসন্তকাল। মধু বলতে, বসন্তকালকে বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে বসন্তের সখা কোকিলের আরেক নাম হচ্ছে ‘মধুসখ’ বা ‘মধুসখা’। হিন্দি এবং ফারসিতে ‘বাহারি’ মানে মধুকাল, মধুমাস। আবার ‘বাহারকে দিন’ মানে বসন্তকাল।
বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাস, রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে হাজার হাজার বৈষ্ণবপদ লিখেছেন। এসব কবিতার বড় অংশজুড়ে রয়েছে তাদের প্রেমলীলা। বৈষ্ণব কবিতায় প্রেমরসের আরেক নাম ‘মধুর রস’। কবিতার পঙ্ক্তি ছাড়াও অভিধান মতে ফাল্গুন ও চৈত্র মাস মিলে বসন্তকাল। ‘মধু’ বলতে বসন্তকালকে বোঝানো হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে দিন বড় এবং রাত ছোট। অনাবৃষ্টির কারণে খাল-বিল, পুকুর ও নদী-নালার পানি শুকিয়ে যায়। মাসের শুরু বা মাঝে মধ্যে বিকেলে প্রচণ্ড কালবৈশাখী ও বজ্রসহ বৃষ্টি হয়, যা ধুলোমাখা প্রকৃতিকে সজীব করে। জ্যৈষ্ঠ মাসে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম পড়ে। আউশ ধানের চারা রোপণের কাজ এ সময়েই শুরু। গ্রাম-বাংলায় এ মাসেই বাড়ি বাড়ি পাকা ফলের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। জ্যৈষ্ঠ মাস হলো, তীব্র দাবদাহের মাঝেও তৃষ্ণা মেটানো এবং প্রকৃতির পাকা ফলের সুধাস্বাদনের অনন্য সময়। এই মাস প্রকৃতিকে যেমন নাড়া দেয় ভিন্নভাবে, তেমনি জনজীবনে দেখা দেয় বিচিত্র প্রভাব।
বিশ্বব্যাপী যখন জলবায়ুর পরিবর্তন, সেখানে পৃথিবীর একমাত্র ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে জলবায়ুর পরিবর্তন স্পষ্ট। ঋতুচক্রের পরিক্রমায় ঋতু পরিবর্তিত হচ্ছে আপন গতিতে। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহের আবহাওয়া বলে দেয়, তপ্ত ধরাকে শীতল করতে বর্ষা আসছে।
