নতুন উদ্যোক্তা যারা

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০১:২০ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শিল্প, প্রযুক্তি এবং সেবা খাতের দ্রুত প্রসারের ফলে দেশে উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হয়েছে এক সম্ভাবনাময় পরিবেশ। ‘চাকরি খোঁজা’ থেকে ‘চাকরি তৈরি’ এই মানসিকতার পরিবর্তনই এখন দেশের তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শিখাচ্ছে। তবে এই যাত্রা যেমন সম্ভাবনায় ভরপুর, তেমনি বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়।

উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম : কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ গত এক দশকে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, ই-কমার্সের প্রসার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সহজলভ্যতা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পথ খুলে দিয়েছে। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উদ্যোগ এবং বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে।

বিশেষ করে Startup Bangladesh Limited  দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট প্রদান করে তাদের ব্যবসা বড় করার সুযোগ তৈরি করছে। একইভাবে iDEA Project  তরুণ উদ্ভাবকদের প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা দিচ্ছে।

ফান্ডিং ও সহায়তা : কী কী সুযোগ আছে

বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের জন্য এখন বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের পথ রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক উদ্যোক্তা অনুদান (grant) বা স্বল্পসুদে ঋণের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করেন।

ইধহমষধফবংয ইধহশ বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন (refinance) স্কিমের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে, যাতে তারা নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়। অন্যদিকে  business plan ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ করে দিচ্ছে।

বেসরকারি খাতেও সুযোগ বাড়ছে। ইধহমষধফবংয অহমবষং ঘবঃড়িৎশ-এর মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যদিও এখানে প্রতিযোগিতা যথেষ্ট বেশি।

অবকাঠামো ও নীতিগত সুবিধা

উদ্যোক্তাদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা উন্নয়নে কাজ করছে Bangladesh Hi-Tech Park Authority। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক স্থাপন করে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের জন্য অফিস স্পেস, কর-সুবিধা এবং অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ই-গভর্ন্যান্স সেবার বিস্তারের ফলে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

বাস্তব চ্যালেঞ্জ : যে দিকগুলো উপেক্ষা করা যায় না

যদিও সুযোগ বাড়ছে, তবুও উদ্যোক্তাদের সামনে বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা রয়ে গেছে।

প্রথমত, ফান্ডিং পাওয়া এখনো সহজ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীরা প্রমাণিত ব্যবসা বা শক্তিশালী পরিকল্পনা ছাড়া অর্থায়ন করতে আগ্রহী হন না।

দ্বিতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব অনেক স্টার্টআপের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তিনির্ভর খাতে এই সমস্যা আরও প্রকট।

তৃতীয়ত, নীতিগত জটিলতা ও ব্যুরোক্র্যাটিক ধীরগতি অনেক সময় উদ্যোক্তাদের গতি কমিয়ে দেয়। যদিও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, তবুও এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য করণীয়

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সফল হতে হলে নতুন উদ্যোক্তাদের কিছু বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, একটি সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনা (business plan) তৈরি করা জরুরি। এটি শুধু নিজের জন্য নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল উপস্থিতি নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য। একটি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং অনলাইন মার্কেটিং সবকিছুই ব্যবসার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তৃতীয়ত, নেটওয়ার্কিং বাড়াতে হবে। বিভিন্ন সেমিনার, স্টার্টআপ ইভেন্ট এবং কমিউনিটিতে অংশগ্রহণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সবশেষে, ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। উদ্যোক্তা যাত্রায় ব্যর্থতা একটি স্বাভাবিক বিষয়।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য এখন সময়টি নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়। সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে উঠছে। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত