দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন

কারাগারে থাকা শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারকে আইনি নোটিশ

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

সারাদেশে কারাগারগুলোতে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টিসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গত ১২ মে আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের আইনজীবী নাফিউল আলম সুপ্ত’র পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল এ নোটিশ পাঠান।

আজ শনিবার (১৬ মে) বিষয়টি জানা যায়। স্বরাষ্ট্র সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সচিব, সমাজ কল্যাণ সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উদ্দেশ্যে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো হয়।

গত ৮ মে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আইনি নোটিশে এ প্রতিবেদনের বিস্তারিত উল্লেখ করে  অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো চিহ্নিত ও পর্যালোচনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের অধিকার সমুন্নত রাখা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

এছাড়া সন্তানসহ নারী বন্দীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ক্ষেত্রে, শিশুদের কল্যাণ ও সর্বোত্তম স্বার্থে, মায়েদের প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, কাউন্সেলিং, বিনোদন এবং শিশু-বান্ধব জীবনযাত্রার পরিবেশ সম্পর্কিত সুবিধার ন্যুনতম মান নিশ্চিতের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নোটিশের ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হবে বলে দেশ রূপান্তরকে জানান অ্যাডভোকেট কাজী জাহেদ ইকবাল।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২৯৯ জন শিশু মায়েদের সঙ্গে রয়েছে। যাদের মধ্যে ১৫৩ জন মেয়ে এবং ১৪৬ জন ছেলে। এই শিশুদের মায়েরা কেউ সাজা খাটছেন, কারও মামলা রয়েছে বিচারের পর্যায়ে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ফাঁসির রায়ের পর ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে এক নারীর সঙ্গে ছয় বছর ধরে কনডেম সেলে রয়েছে এক কন্যা শিশু। সবচেয়ে বেশি ৫১ শিশু রয়েছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে থাকা শিশুদের প্রায় সবাইকে থাকতে হয় নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা সেলে, যেখানে অন্য সাজাপ্রাপ্ত বা হাজতিরা থাকেন। যাদের বেশিরভাগ হত্যা ও মাদক মামলার আসামি।

এতে বলা হয়, প্রায়শই অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলায় শিশুসহ মায়েদের জামিন না-মঞ্জুর হচ্ছে। তাদের কেউ কারাগারে ডিভিশন বা বাড়তি সুবিধা পান না। ফৌজদারি আইনে নারীদের জামিন বিষয়ে বিবেচনার সুযোগ আছে। অন্যদিকে লঘু অপরাধে বিকল্প কারাবাসের (প্রবেশন) বিধান থাকলেও এর চর্চা ও প্রয়োগ কম। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের কারাগারগুলো এখনো সংশোধন কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে কিছু সুবিধা থাকলেও জেলা কারাগারে সেটি নেই। সেখানে নেই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। নেই যথাযথ শিক্ষা, খেলা ও বিনোদনের সু-ব্যবস্থা। উপরন্তু কতিপয় চিহ্নিত আসামি ও পেশাদার অপরাধীর সংস্পর্শে আসছে শিশুরা। কারাগারগুলোতে শিশুদের মনোজগতের ঘাটতি পূরণে কাউন্সেলিংয়েরও কোনো সুবিধা নেই।

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩, ৬, ২৪, ২৭, ২৮ এবং ৩১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের উপর সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, যাতে শিশুদের সম্পর্কিত সকল কার্যক্রমে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রাথমিক বিবেচনার বিষয় হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে শিশুর বেঁচে থাকা, বিকাশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খেলার অধিকার যাতে রক্ষা করা হয়।

এছাড়া নারী বন্দীদের সাথে আচরণ এবং নারী অপরাধীদের জন্য অ-কারাগারমূলক ব্যবস্থা সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিধিমালা (ব্যাংকক বিধিমালা)-এর ৪৯ থেকে ৫১ নং ধারায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যে, কারাগারে তাদের মায়ের সাথে বসবাসকারী শিশুদের বন্দী হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়, তাদের যথাযথ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য কারাগারের বাইরের শিশুর মতো যথাসম্ভব উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ প্রদান করা উচিত এবং তাদের মায়েদের তাদের সাথে সময় কাটানোর সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়া উচিত।

নোটিশে আরও বলা হয়, কারাগারের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত শিশু-সংবেদনশীল সুবিধার অভাব, সংবিধানের ২৭, ৩১ এবং ৩২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিশ্চিতকৃত আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনসম্মত আচরণ, জীবন ও স্বাধীনতার মতো তাদের মৌলিক অধিকারসমূহকে লঙ্ঘন করে।

অ্যাডভোকেট জাহেদ ইকবাল বলেন, ‘পৃথিবীজুড়েই শিশুদের বিষয় সবার আগে। যে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আছে, সেগুলো যেন আইন ও বিধানের মাধ্যমে সমাধান করা হয় সেটাই আমরা চেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘কারাগারে নারী ও শিশুদের জন্য যেসব সুযোগ সুবিধা থাকে, সেগুলো নিশ্চিত করা একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। আর মূল বিষয় হলো, অভিভাবক বা মায়ের কারণে শিশুদের যেন জেলে থাকতে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়েছি।’

আইনজীবী বলেন, নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাইনি। যদি নোটিশের জবাব না পাওয়া যায় তাহলে আমরা চলতি সপ্তাহেই রিট মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত