এক ক্লিকেই মিলছে পরীক্ষার সব তথ্য

আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ০২:৩৯ এএম

পাবলিক পরীক্ষায় কেন্দ্রভিত্তিক পরীক্ষার্থীর উপাত্ত, উত্তরপত্র সংগ্রহ ও বিতরণে অনলাইন পদ্ধতি চালু করল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। এতে পরীক্ষা চলাকালে সব ধরনের তথ্য চলে আসবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে। এতে এক ক্লিকেই পরীক্ষা সম্পর্কিত সব তথ্য পাওয়া যাবে। নতুন এই পদ্ধতির সুফলও পাচ্ছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল তৈরির সময় এখন আর উত্তরপত্র মিসিংয়ের ঘটনা ঘটছে না। আবার পরীক্ষকরাও ফলাফল প্রকাশের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সম্মানী পেয়ে যাচ্ছেন।

নতুন এই পদ্ধতির উদ্যোক্তা হলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে তিনি এই অনলাইন পদ্ধতি চালু করেন এবং এ বছর আরও কিছু সংযুক্তি আনা হয়েছে। নতুন এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে গতকাল রবিবারের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুপুর দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কক্ষে গিয়ে দেখা যায় তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিনে পরীক্ষার উপাত্ত দেখছেন। শিক্ষা বোর্ডের ২১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে তখন ১৯২টি কেন্দ্রের উপাত্ত এসেছে উনার ড্যাশবোর্ডে। সেখানে কেন্দ্রভিত্তিক উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, বহিষ্কার ও মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা রয়েছে। কেন্দ্র অনুযায়ী কোন শিক্ষক এসব উপাত্ত এন্ট্রি দেবেন সেই শিক্ষকের মোবাইল নম্বরও রয়েছে। আবার কেন্দ্র থেকে এসব উত্তরপত্র কি সরাসরি শিক্ষা বোর্ডে এনে জমা দেবে নাকি ডাকযোগে পাঠাবে তাও জানিয়ে দিচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক। দুপুর পৌনে ২টার দিকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক যখন আবার রিফ্রেশ দিলেন তখন উপাত্তের সংখ্যা ২১০-এ গিয়ে পৌঁছে। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাটা ইনপুটের সংখ্যা বাড়ছে।

শুধু কি এসব উপাত্ত? বোর্ডে যেসব উত্তরপত্র আসছে সেগুলো কোন কোন কর্মচারী রিসিভ করবেন সেই তালিকাও অনলাইনে দেওয়া আছে। বোর্ডের কর্মচারী রিসিভের সঙ্গে বোর্ডের সার্ভারে উত্তরপত্রের সংখ্যা জমা হয়ে যাচ্ছে। তাহলে এসব উত্তরপত্র পরীক্ষকরা কীভাবে সংগ্রহ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আমার বোর্ডের আওতাধীন সব শিক্ষকের ডাটাবেইজ রয়েছে। সেই ডাটাবেইজে পয়েন্টের ভিত্তিতে সিনিয়রিটি করা আছে। কোনো বিষয়ের ৭০০ শিক্ষকের মধ্যে আমি ৩০০ শিক্ষককে সিলেক্ট করে সঠিক চিহ্নতে মার্ক করলে তাদের কাছে মেসেজ চলে যাবে। সেই মেসেজে তারা কোনদিন কয়টার সময় উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে আসবেন তা জানতে পারবেন। আবার এসব উত্তরপত্র সংগ্রহ করার তিনদিনের মধ্যে অনলাইনে এন্ট্রি করবেন কে কতটি উত্তরপত্র পেলেন। এতে সব পরীক্ষক উত্তরপত্রের সংখ্যা অনলাইনে এন্ট্রি করলে পরীক্ষার দিনের উপস্থিত পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তা মিলে যাবে।

নতুন এই পদ্ধতি চালু করার কারণে পরীক্ষকরা ফলাফল প্রকাশের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে তাদের সম্মানীও পেয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী। তিনি বলেন, আমি যখন শিক্ষক হিসেবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতাম তখন এক বছরের মূল্যায়নের সম্মানী আরেক বছর পেতাম। আর আমরা এখন পুন:নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশের পরপরই দিয়ে দিচ্ছি। এতে পরীক্ষকদের হিসাব নম্বরে স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে টাকা চলে যাচ্ছে। চেক সংগ্রহ কিংবা জমা দেওয়ার কোনো বিষয় নেই।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে নতুন এই পদ্ধতি চালুর ফলে সঠিক তথ্য সবার আগে পাওয়া যাচ্ছে। ফলাফল প্রকাশের সময় টেবুলেশন নীতিমালা প্রয়োগ করতে হচ্ছে না।

 টেবুলেশন নীতিমালা বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আগে পরীক্ষার ফলাফল তৈরির সময় কিছু উত্তরপত্র মিসিং পাওয়া যেত। তখন টেবুলেশন নীতিমালা অনুযায়ী এক পত্রের প্রাপ্ত নম্বর অপর পত্রের নম্বর হিসেবে বিবেচনা করে ফলাফল তৈরি করা হতো। তবে গত বছর এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। অর্থাৎ ২০২৫ সাল থেকে এই অনলাইন পদ্ধতি চালুর পর থেকে উত্তরপত্র মিসিং হওয়ার রেকর্ড নেই।

এ বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের নতুন এই অনলাইন পদ্ধতির সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিজেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডর ফলাফল তৈরির কাজে সহায়তা করে আসছি গত কয়েক বছর থেকে। তবে গত বছর টেবুলেশন নীতিমালা প্রয়োগ করতে হয়নি অর্থাৎ কোনো উত্তরপত্র মিসিংয়ের ঘটনা ছিল না। পূর্বে এমন ঘটনা ঘটত।

তিনি আরও বলেন, নতুন এই পদ্ধতি চাইলে দেশের অন্য বোর্ডগুলোও প্রয়োগ করতে পারে। এতে এক ক্লিকেই সব তথ্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে চলে আসবে।

তবে এই পদ্ধতিকে পুরোপুরিভাবে নতুন বলতে নারাজ ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, আমরা ঢাকাবোর্ড আমাদের মতো করে অনলাইন পদ্ধতিতে উত্তরপত্রের তথ্য সংগ্রহ করে আসছি। এতে কোন উত্তরপত্র কোথায় আছে আমরা সেটাও বলতে পারি। তবে এই অনলাইন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক সময় ওয়েবসাইট হ্যাং হয়ে গেলে কাজ করা যায় না। আবার শিক্ষা বোর্ডগুলো আইটি খাতে অভিজ্ঞ জনবলও দরকার।

কেন্দ্র সচিব, পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের কথা : কথা হয় চট্টগ্রামের সরকারি মুসলিম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোরশেদ উজ জামানের সঙ্গে। কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন করা এই শিক্ষক জানান, আমরা আগের মতোই উত্তরপত্রগুলো শিক্ষা বোর্ডে পাঠাই। তবে অনলাইন পদ্ধতিতে পরীক্ষা শুরুর পরপরই উপাত্তগুলো ইনপুট দেওয়া হয় বলে শিক্ষা বোর্ড আগেই তথ্য পেয়ে যায়। এতে কাজে অনেক গতি এসেছে।

কথা হয় চট্টগ্রামের কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরীর সিনিয়র শিক্ষক ও বাংলা প্রথম পত্রের প্রধান পরীক্ষক খালেদা ফেরদৌস জাহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা একসময় শিক্ষা বোর্ড থেকে চিঠি পেতাম উত্তরপত্র সংগ্রহের জন্য। এখন মোবাইলে মেসেজ চলে আসে। এছাড়া আমি প্রধান পরীক্ষক হিসেবে ডাটা এন্ট্রি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেনে যাচ্ছেন আমার কাছে কতটি উত্তরপত্র আছে। গত বছর থেকে চালু হওয়া এই পদ্ধতি অনেক স্বচ্ছ। একই সঙ্গে আমরা আগের তুলনায় এখন দ্রুত সম্মানীও পাচ্ছি।

নতুন এই পদ্ধতি চালুর উৎস কোথায় পেয়েছেন জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আমি যখন সরকারের জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) কারিকুলাম স্পেশালিস্ট ছিলাম তখন নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে এই পদ্ধতিতে শিক্ষকদের তথ্য ও উত্তরপত্র বিতরণ দেখেছি। এই শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার গত বছর থেকে তা পরীক্ষামূলকভাবে সফল হওয়ার পর এ বছরও আরও কিছু যুক্ত করেছি।

উল্লেখ্য, বর্তমানে চলছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পাবলিক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত