ঈদ কেন্দ্র করে পরিবারের পুরুষের পাশাপাশি গৃহিণীদের ওপরও পড়ে বড় ধরনের দায়িত্ব। ঘর গোছানো থেকে শুরু করে বাজার করা, মসলাপাতি প্রস্তুত, রান্নাঘর পরিষ্কার, ফ্রিজ গোছানো। সবকিছুতেই প্রয়োজন পরিকল্পনা ও ধৈর্য। বিশেষ করে শহুরে জীবনে সীমিত সময় ও অল্প জায়গার মধ্যে পুরো আয়োজন সামলানো অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈদের আগেই ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নিলে কাজ যেমন সহজ হয়, তেমনি ঈদের দিনটাও উপভোগ করা যায় নিশ্চিন্তে। ঈদ প্রস্তুতি নিয়ে লিখেছেন নাহিন আশরাফ
পরিকল্পনা আগে থেকেই
কোরবানির ঈদের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিকল্পনা। কোন দিন বাজার করবেন, কোন দিন রান্নাঘর পরিষ্কার করবেন, কী কী কিনতে হবে এসব লিখে একটি তালিকা তৈরি করলে কাজ গুছিয়ে করা সহজ হয়। পরিবারের সদস্যদেরও ছোট ছোট দায়িত্ব ভাগ করে দিলে গৃহিণীর একার চাপ কমে যায়।
ঈদের বাজার সদাই
কোরবানির ঈদে বাজারের তালিকা সাধারণত অনেক বড় হয়। মাংস রান্নার জন্য আলাদা মসলা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, তেল, দই, বাদাম, কিশমিশ, ঘি, চাল, সেমাই সবকিছুর চাহিদা বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আগে থেকেই তালিকা করে বাজার করা উচিত। বিশেষ করে কোরবানির আগের কয়েকদিন বাজারে অতিরিক্ত ভিড় থাকে। সে সময় অনেক পণ্যই বেশি দামে বিক্রি হয়। তাই শুকনো মসলা, চাল-ডাল, তেল বা ফ্রোজেন খাবারের মতো জিনিস কয়েক দিন আগেই কিনে রাখা ভালো। এতে সময়ও বাঁচে, আবার বাড়তি চাপও কমে।
মসলার প্রস্তুতি
ঈদের রান্নায় সবচেয়ে বেশি সময় যায় মসলা প্রস্তুত করতে। পেঁয়াজ কাটা, আদা-রসুন বাটা, গরম মসলা গুঁড়া সবই সময়সাপেক্ষ কাজ। তাই অনেক গৃহিণী এখন ঈদের আগেই এসব প্রস্তুত করে রাখেন। পেঁয়াজ বেরেস্তা করে সংরক্ষণ করা যায় কয়েক দিন। আদা-রসুন বেটে ছোট ছোট ভাগে ফ্রিজে রাখা যায়। গরম মসলা আলাদা ভেজে গুঁড়া করে রাখলে রান্নার সময় অনেক সুবিধা হয়।
ফ্রিজ পরিষ্কার ও জায়গা তৈরি
কোরবানির পর প্রচুর মাংস সংরক্ষণ করতে হয়। তাই ঈদের অন্তত দুই-তিন দিন আগে ফ্রিজ খালি করে অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলে দেওয়া উচিত। ফ্রিজ ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হবে। ফ্রিজে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা জরুরি। অনেক সময় পুরনো খাবার বা বরফ জমে জায়গা কমে যায়। সেগুলো সরিয়ে নিলে নতুন মাংস সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি ছোট ছোট প্যাকেটে মাংস রাখার জন্য আগে থেকেই জিপল্যাক ব্যাগ বা বক্স কিনে রাখা সুবিধাজনক।
রান্নাঘর গোছানো
ঈদের সময় রান্নাঘরই হয়ে ওঠে বাড়ির সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা। তাই রান্নাঘর পরিষ্কার ও গোছানো রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছুরি, কাটিং বোর্ড, বড় হাঁড়ি, কড়াই, প্রেশার কুকার সব প্রয়োজনীয় জিনিস আগে থেকেই ধুয়ে পরিষ্কার করে ঠিকঠাক জায়গায় রাখতে হবে। দা-বঁটি, ছুরিতে ধার করার প্রয়োজন হলে আগেই ধার করিয়ে নিতে হবে। গ্যাসের চুলা ঠিক আছে কিনা, সিলিন্ডারে গ্যাস আছে কিনা, পানির ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা এসবও দেখে নেওয়া দরকার। কারণ ঈদের দিন কোনো সমস্যায় পড়লে তখন সমাধান করা কঠিন হয়ে যায়।
নতুন কিছু কিনতে হলে
কোরবানির ঈদ উপলক্ষে অনেক পরিবার রান্নাঘরের নতুন কিছু জিনিস কেনেন। যেমন বড় হাঁড়ি, ডিপ ফ্রিজ, ব্লেন্ডার, মাংস কাটার ছুরি, ফুড স্টোরেজ বক্স কিংবা পরিবেশনের জন্য নতুন ডিনার সেট। তবে কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শুধু ট্রেন্ড দেখে বা অন্যের সঙ্গে তুলনা করে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ঠিক নয়। পরিবারের ব্যবহার ও বাজেট বিবেচনা করে কেনাকাটা করলে চাপ কম পড়ে। অতিরিক্ত জিনিস না কিনে ব্যবহার উপযোগী, মাল্টিপারপাস ও টেকসই পণ্য কেনাই ভালো সিদ্ধান্ত।
মাংস সংরক্ষণের ধরন
কোরবানির পর সবচেয়ে বড় কাজগুলোর হলো মাংস ভাগ ও সংরক্ষণ। অনেক সময় সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় মাংসের স্বাদ নষ্ট ও পুষ্টিগুণ কমে যায়। তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকা দরকার। মাংস ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সংরক্ষণ করলে পরে ব্যবহার সহজ হয়। রান্নার ধরন অনুযায়ী আলাদা প্যাকেট করা যেতে পারে। যেমন কোরমার জন্য, ভুনার জন্য, কিমার জন্য আলাদা ভাগ। প্যাকেটের ওপর তারিখ লিখে রাখলে পুরনো ও নতুন মাংস আলাদা করা সহজ হয়।
স্বাস্থ্যবিধির দিকেও নজর দিন
কোরবানির ঈদে মাংস নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা, আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা, মাংস ধরার পর ভালোভাবে হাত ধোয়া এসব অভ্যাস জরুরি। অনেক সময় অতিরিক্ত কাজের চাপে গৃহিণীরা নিজের খাওয়া-দাওয়া বা বিশ্রামের দিকেও নজর দিতে পারেন না। সুস্থ থাকতে হলে নিজের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান ও বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। কাজ করার সময় প্রয়োজনে গ্লাভস ব্যবহার করতে পারেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা
কোরবানির ঈদে বর্জ্যরে পরিমাণও বেড়ে যায়। পশুর বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। গৃহিণীরা চাইলে বাসার ভেতরে আলাদা ডাস্টবিন রাখতে পারেন, যাতে রান্নাঘরের আবর্জনা দ্রুত ফেলা যায়। ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ ও জীবাণুর ঝুঁকি কমে।
পরিবারের সবার সহযোগিতা
অনেক পরিবারে এখনো ঈদের পুরো প্রস্তুতির চাপ শুধু নারীদের ওপর পড়ে। কিন্তু কোরবানির ঈদ একটি পারিবারিক আয়োজন। তাই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত। কেউ বাজার করতে পারেন, কেউ ফ্রিজ পরিষ্কার করতে পারেন, কেউ মাংস প্যাকেট করতে সাহায্য করতে পারেন। এতে কাজ দ্রুত শেষ হয় এবং গৃহিণীর মানসিক চাপও কমে।
