মাংস রান্না ও পুষ্টিগুণ

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০১:৫৩ এএম

মাংস আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে গরুর মাংস বাংলাদেশে উৎসব, পারিবারিক আয়োজন কিংবা সাধারণ খাবার সব ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়। তবে অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ ধারণা আছে, গরুর মাংস স্বাস্থ্যকর নয় বা এতে চর্বি বেশি থাকে বলে এটি এড়িয়ে চলা উচিত। পুষ্টিবিদদের মতে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং সঠিক পরিমাণে এবং সঠিকভাবে রান্না করা হলে গরুর মাংস হতে পারে অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাদ্য।

কথা বলেছি ডায়েট কাউন্সেলিং সেন্টারের প্রধান পুষ্টিবিদ ও ফাউন্ডার, সৈয়দা শারমিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, গরুর মাংস নিয়ে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও এতে প্রচুর পুষ্টিগুণ রয়েছে। যদি পরিমাণ বুঝে এবং সঠিকভাবে খাওয়া যায়, তাহলে শরীরের জন্য উপকারী। গরুর প্রতিটি অংশে আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে। এতে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, পটাসিয়াম, সোডিয়াম এবং উচ্চমানের প্রোটিন।

তিনি আরও জানান, সমস্যা তৈরি হয় মূলত রান্নার ভুল পদ্ধতির কারণে। অতিরিক্ত তেল, বেশি ঝোল, উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় রান্না এসব কারণে মাংসের পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ভিটামিন বি গ্রুপ পানিতে দ্রবণীয় হওয়ায় অতিরিক্ত পানি বা ঝোল ব্যবহার করলে তা হারিয়ে যায়।

সঠিক রান্নার পদ্ধতি : গরুর মাংস সঠিকভাবে রান্না করতে হলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমত, মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করা উচিত। এতে মাংস ভালোভাবে সিদ্ধ হয় এবং ভেতরের পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে অক্ষুণœ থাকে। খুব বেশি পানি ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এতে পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ঝোলযুক্ত খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

দৃশ্যমান চর্বি বা ফ্যাট কেটে ফেলে রান্না করলে এটি আরও স্বাস্থ্যকর হয়। যদিও পুরো ফ্যাট আলাদা করা সম্ভব নয়, তবুও অতিরিক্ত চর্বি কমানো উচিত। রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে মাংসের নিজস্ব তেল দিয়েই রান্না করার চেষ্টা করা ভালো। তেহারি বা কালা ভুনার মতো ভারী ও তৈলাক্ত রান্নার পরিবর্তে সাধারণ ভুনা বা হালকা স্ট্যু পদ্ধতি বেশি উপকারী। এতে মাংসের স্বাদ বজায় থাকে এবং শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। রান্নার সময় মাংসের সঙ্গে কিছু সবজি যোগ করলে এটি আরও স্বাস্থ্যসম্মত হয়ে ওঠে। যেমন মাশরুম, বাঁধাকপি, গাজর বা অন্যান্য ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি যুক্ত করলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রভাব কিছুটা কমে। এসব সবজি হজমেও সাহায্য করে এবং খাবারের পুষ্টিমান বাড়ায়।

পেঁপে বাটা বা কাঁচা পেঁপে ব্যবহার করলে মাংস দ্রুত সিদ্ধ হয় এবং সময় কম লাগে। এতে রান্নার সময় কম তাপের প্রভাব পড়ে, ফলে পুষ্টি উপাদানও বেশি সংরক্ষিত থাকে। কোরবানির সময় গরুর মাংস দিয়ে বারবিকিউ বা গ্রিল করা খাবারের প্রচলন অনেক দেখা যায়। যদিও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবিকিউ নিয়মিত খাওয়ার জন্য আদর্শ পদ্ধতি নয়। তবে যারা বারবিকিউ খেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, মাংস অতিরিক্ত পুড়িয়ে ফেলা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, পরিবেশনের আগে অবশ্যই মাংসের উপরিভাগের পোড়া বা কালো অংশ কেটে বা ফেলে দিয়ে খাওয়া উচিত, কারণ এই অংশে ক্ষতিকর উপাদান বেশি থাকে। যাদের শরীরের ওজন কম, রক্তচাপ কম বা যারা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন তাদের জন্য গরুর মাংস বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। এতে থাকা আয়রন ও প্রোটিন শরীরের শক্তি বৃদ্ধি ও রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। তবে যারা উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তা ছাড়া গরুর মাংসের সঙ্গে পর্যাপ্ত সালাদ বা সবজি খেলে খাবারের ভারসাম্য বজায় থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গরুর মাংস ক্ষতিকর নয়, বরং ভুলভাবে রান্না ও অতিরিক্ত গ্রহণই একে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। সঠিক পদ্ধতিতে, কম তেল ও কম পানি ব্যবহার করে, ধীরে রান্না করলে এর পুষ্টিগুণ অনেকাংশে অটুট থাকে। সচেতনভাবে রান্না ও পরিমিত খাওয়ার মাধ্যমে গরুর মাংসকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত