চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রুস্তমহাটের শতবর্ষী কামারপট্টির কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে ভেসে আসে লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, হাপরের ফোঁসফাঁসে কাঠকয়লার আগুনে উত্তপ্ত লাল লোহায় আঘাত করে চলেছেন শাকাল ও আশীষ কর্মকার। এভাবে গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার কামারপট্টির কর্মকাররা। কামারপট্টির লোহা-লক্কড়ের আওয়াজ, হাপরের ফোঁসফাঁস আর হাতুড়িপেটার টুংটাং শব্দ এই সময়ের সবচেয়ে আনন্দ আর উৎসবের। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগেও তারা ধরে রেখেছেন গ্রামীণ ও নগর জীবনে অর্থনীতির অন্যতম বলয়।
সামনে যে কোরবানির ঈদ! দিনটি যতই ঘনিয়ে আসছে, কামারদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। তবে আনন্দের এই ব্যস্ততায় তাদের মধ্যে নানাবিধ উদ্বেগও পরিলক্ষিত হয়েছে। কেউ কেউ কাজ করলেও পরিষ্কার বোঝা যায়, অনেকটা নেতিয়ে পড়েছে এ ঐতিহ্য। তাদের আশঙ্কা, কয়েক বছর পর এখানে কামারপট্টি থাকবে না। কালের বিবর্তনে একটি সময় হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ পেশা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন মানুষের কাছে এ শিল্পের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। বংশপরম্পরায় চলে আসা একসময়ের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
১০০ বছর আগেও রমরমা ছিল রুস্তমহাটের এই কামারপট্টি। এমনকি দুই দশক আগেও এখানকার তৈরি জিনিসপত্রের কদর ছিল চট্টগ্রামজুড়ে। বর্তমানে কামারপট্টির ২০টি দোকানের মধ্যে ৯টি এখনো বংশপরম্পরায় শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। জানা গেছে, প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগের কয়েকদিন কামারপট্টিতে দাঁড়ানোর জায়গা মিলতো না। এখন আর সেই ভিড় নেই। এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে আধুনিক মেশিনে দা-ছুরির শান আর বাজারে আধুনিক স্টিল ও লোহার তৈরি জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি লোহার উপকরণের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে।
কামারপট্টির কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা যায়, কামারশিল্পীরা কেউ দা-বঁটি বানাচ্ছেন। অনেকে আবার সেগুলোতে ধার দিচ্ছেন। সামনে সাজিয়ে রাখা আছে এসব যন্ত্র। তবে ক্রেতার তেমন উপস্থিতি নেই। কেউ আসছেন, দামদর করে আবার চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পুরনো দা-ছুরি নিয়ে আসছেন শান দিতে। কামারদের তথ্য মতে, উপজেলার রুস্তমহাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে অন্তত ৩৫টি কামারশিল্পের দোকান রয়েছে। ঈদের সময়টাতে এসব দোকানের শ্রমিকের মুখে হাসি ফুটলেও বছরজুড়ে মন্দা থাকায় তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন খুব একটা হয় না।
কামারপট্টির বাদল কর্মকার বলেন, অন্যবার কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই মানুষ কেনাকাটা শুরু করেন। কিন্তু এবার এখনো তেমন কোনো ক্রেতা আসছেন না। তবে ঈদের দুই এক দিন আগে ক্রেতাদের সমাগম বাড়বে বলে আশা করছি। অন্যদিকে কোরবানির ঈদ এলে এসব লোহার জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় বলে দাবি করেছেন ক্রেতারা।
অনীল কর্মকার জানান, এখন লোহা আর কয়লার দাম বেশি। এজন্য জিনিসের দামও বাড়াতে হয়েছে। এখন দা-বঁটির দাম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। আগে যা ছিল ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। ধামার দাম সাইজ বুঝে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ছুরি ছোট-বড় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। পশু জবাইয়ের ছুরি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। আগের চেয়ে প্রত্যেক জিনিসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি।
ছয় দশক ধরে পারিবারিক ব্যবসা ধরে রেখেছেন মিলন কর্মকার (৭৫)। বাবার হাত ধরেই ১০ বছর বয়সে কামারপট্টিতে ঢোকেন তিনি। ৬৫ বছর এক দোকানেই কেটেছে তার। দেখেছেন দা, ছুরি, দামা, কুড়াল বানানোর সোনালি সময়। এখন দেখছেন খরা। দোকানে মন খারাপ করেই বসে থাকতে দেখা গেল তাকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও দা-ছুরি কেনা ও ধার দেওয়ার জন্য মানুষ লাইনে দাঁড়াত। কোরবানির ঈদ এলে দিন-রাত কুল পেতাম না। এখন আর সেদিন নেই। পেশাটাই যেন শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিশোধ নিচ্ছে। আধুনিক দা, ছুরিই যেন আমাদের আয়-রোজগার কেটে নিয়ে গেছে।’
তবে এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানালেন প্রদীপ কর্মকার। তিনি বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন শিল্প রক্ষায় কত পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের জন্য কেউ কিছু করছে না। আমাদের পেটে ভাত জোগাড় হচ্ছে না। বিনা সুদে ঋণ পেলে ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখতে পারতাম। শত বছরের একটা শিল্পও টিকে থাকত।’
এদিকে শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা জানালেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কামার শিল্প অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। এর কারণ মানুষ দিন দিন আধুনিক প্রযুক্তির জিনিসপত্রের দিকে ঝুঁকছে। এ দেশের প্রত্যেকটি শিল্পই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই এটি টিকে থাকুক। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে তাদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করব।’
