অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে। চুক্তিটিতে দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে, সে বিষয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। সেই সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন মনে করেন, এই চুক্তি সই করার বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়াই যথাযথ হতো।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভিকে গত শনিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি গতকাল সোমবার প্রচারিত হয়।
পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া পেশাদার কূটনীতিক তৌহিদ হোসেন ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তিটি সইয়ের বিষয়ে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না। এটাতে যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (ড. খলিলুর রহমান)। কোনো কারণ হয়তো ছিল পেছনে, যে জন্য আমরা বাধ্য ছিলাম। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে সই করার বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যথাযথ হতো।’
নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তিনদিন পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। সেদিন তৌহিদ হোসেনসহ বিভিন্ন পেশার ১৬ ব্যক্তিকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা করা হয়। এরপর খলিলুর রহমানসহ আরও কয়েক ব্যক্তিকে উপদেষ্টা করা হয়।
সাক্ষাৎকারে দেওয়া তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকের পাশাপাশি মুহাম্মদ ইউনূস প্রতি মঙ্গলবার সাত উপদেষ্টা নিয়ে গঠিত ‘কিচেন কেবিনেটের’ বৈঠক করতেন। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিত। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে গিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, অনেক বিষয়ে কিছু উপদেষ্টার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপরও তাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হতো। কারণ, উচ্চপর্যায়ে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিজের প্রত্যাশার বড় অংশই পূরণ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো এক উপলক্ষে কিচেন কেবিনেটের একটা বৈঠকে যমুনাতে তাকে যেতে হয়েছিল। পরে জেনেছেন যে, প্রতি মঙ্গলবার তারা বসেন। সিদ্ধান্ত নেন কেউ কেউ, এ ধরনের কথাবার্তা শোনা যেত। এর বাইরে তার জানা ছিল না যে, এ রকম একটা গ্রুপ আছে, যারা নিয়মিত বসেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এমনটি জানিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি সরে আসার চিন্তা তিনবার করেছি। তারা (উপদেষ্টা) অনুরোধ করেছেন যে, (পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ) সরকারের জন্য খুবই অস্বস্তিকর হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, তিনি জানতেন যে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দেওয়া চিঠি কোনো কাজে আসবে না।
ভারত কেন চিঠির উত্তর দেয়নি, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘উত্তর কি আশা করেছিলাম আমরা? আমি আশা করিনি।’
এক প্রশ্নের জবাবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিয়ে নিজের ভাবনা জানান তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে একেবারে আউট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, এ রকম থাকবে না। আমাদের মানুষজনের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ না। আমি মনে করি, বিশ্বাস করি যে, তারা রাজনীতিতে ফিরে আসবে; এবং আমার অনুমান, আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নেবে।’
গণঅভ্যুত্থানে ‘ডিপ স্টেট’ সক্রিয় ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বরেন, ‘ডিপ স্টেট’ পৃথিবীতে সব ঘটনার সঙ্গেই জড়িত থাকে। ‘ডিপ স্টেট’ যুক্ত হয়, তবে স্রোতের বিপক্ষে নয়। তারপর তারা ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে।
তিন মাসের কিছু বেশি সময় আগে গঠিত বিএনপি সরকার নিয়ে এখনই মূল্যায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব। তবে তিনি মনে করেন, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সামলানো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি কোনো পক্ষের লোক বলে বিবেচিত হব না, আবার কেউ আমার ওপর খড়গহস্ত হবে না এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এটা সবসময়ই ছিল; এখনো তাই।’
