রাজধানীর পশুর হাট জমে উঠেছে

আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

দুর্মূল্যের এই বাজারে যখন গরু কিনতে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক এই সময়েও রাজধানীর হাটে মিলছে ৬০ হাজার টাকার গরু! গতকাল রাজধানীর ‘কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী’ অস্থায়ী পশুর হাটে ছোট সাইজের গরু ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করবেন বলে জানিয়েছেন খামারিরা। হাটটির নবী ভবনের পশ্চিম পাশে এমন ৫-৭টি গরু বেঁধে রাখতে দেখা গেছে।

শাহেদ মিয়া নামে এক খামারি জানান, ছোট সাইজের দেশি গরুগুলো দুজন মিলে এনেছেন। ওজন সম্পর্কে কোনো ধারণা না দিতে পারলেও ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করবেন বলে জানান তিনি। পাশের একজন বিক্রেতা জানান, ছোট সাইজের গরু এ হাটে ৫০ হাজার টাকাও বিক্রি হয়েছে।

কালো রঙের ছোট সাইজের গরুটির দাম হাঁকাচ্ছেন ৬০ হাজার টাকা। দরদাম করে আরও কিছুটা কমে বিক্রি করবেন বলে জানান তিনি। দেশি ও নিজ গোয়ালে পালন করা হয়েছে। মোটাতাজা করতে কোনো ওষুধ বা হাইব্রিট খাবার খাওয়ানো হয়নি। তবে এই হাটে মাঝারি ও বড় সাইজের গরুর দাম আবার বেশি।

প্রায় ৯ মণ ওজনের কালো রঙের একটি ষাঁড় দুই লাখ টাকায় কিনেছেন মাতুয়াইলের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, গরু পছন্দ হয়েছে, তাই একটু আগভাগেই কিনে নিয়েছি। দুদিন ছেলেমেয়েরা গরু দেখবে, যত্ন নেবে এটাই ঈদের আনন্দ। তার পাশেই প্রায় ৫ মণ ওজনের লাল রঙের একটি ষাঁড় বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।

গতকাল সোমবার দুপুরের বৃষ্টিতে হাটগুলোর বেচাকেনা কিছুটা থেমে থাকলেও বিকেল এবং রাতে বেশ ভালো বেচাকেনা হয়েছে। ‘কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী’ অস্থায়ী পশুর হাটের অনেক গরু-ছাগল বিক্রি হয়েছে। পানির পাম্পের পাশে সড়কে খালি খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের সতর্ক থাকতে মাইকে বারবার ঘোষণা দিতে শোনা গেছে।

ইজারাদার শামীম খান বলেন, এখানে সব ধরনের গরু আছে। বড় সাইজের গরুগুলো কিছুটা কম বিক্রি হলেও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। একদিকে গরু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আবার খামারিরা গরু নিয়ে আসছেন। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের খুশিতে এবারের ঈদ হবে আনন্দময়। আমরা সব শ্রেণির মানুষের কথা বিবেচনা করে খামারিদের হাটে এনেছি।

এদিকে এই হাটের পাশে যাত্রাবাড়ী-শনিরআখড়া সড়কের পাশে খড়, ঘাস, ভূসিসহ গবাদিপশুর নানা খাদ্য বিক্রির জন্য পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া মাংস বানানোর জন্য কাঠের পাটাতন, চাটাই, ছুরিসহ নানা যন্ত্রপাতি বিক্রি হচ্ছে হাটের পাশেই। এসব পণ্য রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতেও বিক্রি করতে দেখা গেছে। তা ছাড়া কাজলা হাটে পিকআপভ্যান ও ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গরু কেনার পর নির্ধারিত পিকআপে করে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তা ছাড়া জাল নোট শনাক্তের জন্য র‌্যাবের বুথ, সহজ লেনদেনের জন্য এটিএম, সিআরএম স্থাপন করা হয়েছে। হাসিল ঘরসহ হাটের নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবককে কাজ করতে দেখা গেছে।

রাজধানীর শাহজাহানপুর গরুর হাটে জামালপুর থেকে গরু নিয়ে আসা এমকে এগ্রোর স্বত্বাধিকারী মনিজ মোর্তজা চৌধুরী গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাটে ১৫টি গরু নিয়ে এসেছি, এর মধ্যে ৬টি বিক্রি হয়েছে। সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, যার ওজন ছিল ৩০০ কেজি। এ ছাড়া বাকিগুলো ১ লাখ ৫৫ হাজার, ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো দামে বিক্রি হয়েছে।

এদিকে আর মাত্র দুদিন পরেই মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদের জন্য পছন্দের পশু কিনতে হাটে হাটে ঘুরছেন নগরবাসী। তাদের পদচারণায় বৃষ্টি আর কাঁদাপানির মধ্যেই জমে উঠেছে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলো। বিগত দিনের তুলনায় গতকাল সোমবার জমজমাট বেচাকেনা হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী গাবতলী হাটসহ অস্থায়ী হাটগুলো ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামে মুখরিত ছিল। দরদাম করে অনেকেই কিনে নিয়ে গেছেন পছন্দের পশু। আবার কেউ আরেকটু যাচাই করতে আজ এবং আগামীকাল হাতে সময় রেখেছেন। তা ছাড়া বৃষ্টির কারণে লালন-পালন করার ঝামেলা এড়াতে অনেকেই ঈদের আগের দিন কোরবানির পশু কিনবেন বলে মনস্থির করেছেন। আবার হাতে দুদিন সময় থাকায় বিক্রেতারা একটু বেশি দাম চাচ্ছেন।

আমুলিয়া হাটে দাম নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষ

আমুলিয়া মডেল টাউনের অস্থায়ী হাট ঘুরে দেখা গেছে, টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা। বৃষ্টির সময় ক্রেতাদের গরুর তাঁবুর নিচে গুটিশুটি হয়ে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। আর বিক্রেতারা ব্যস্ত গরু সরিয়ে বাঁধতে ও তাঁবুর ওপর জমে থাকা পানি সরাতে। কেউ কেউ আবার বৃষ্টির পানিতেই গরু গোসল করাতে নেমে পড়েন। গতকাল সোমবার রাজধানীর আমুলিয়া পশুর হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

হাটে গরু কিনতে আসেন ব্যাংক কর্মকর্তা হাফিজ। দাম নিয়ে খুবই অসন্তুষ্ট তিনি, তাঁবুর নিচে অপেক্ষায় আছেন বৃষ্টি কমার। গরুর দামের অভিজ্ঞতার জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে হাফিজ বলেন, গরুর দাম এখনো অনেক বেশি চাচ্ছে। একটা গরু দেড় লাখ পর্যন্ত বলেছি, কিন্তু ১ লাখ ৮০ হাজারের নিচে দিচ্ছে না। তাই আজ বাসায় ফিরে যাচ্ছি, কালকে আবার আসব। আশা করি কাল-পরশু দাম ছাড়বেন ব্যাপারীরা।

তবে বিক্রেতাদের দাবি, গরুর খাবারসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম বেশি হওয়ায় কমে গরু ছাড়তে পারছেন না তারা। ডেমরার কোনাপাড়া থেকে হাটে ৪০টি গরু নিয়ে এসেছেন খামারি ইরফান। এর মধ্যে ১৫টি গরু বিক্রি করেছেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে ইরফান বলেন, গরুর খাবারের দাম প্রতি কেজিতে আগের থেকে ২০ টাকার মতো বেড়েছে। এ ছাড়া শহরে গরু পালি, খরচটাও একটু বেশি পড়ে। ক্রেতাদের কাছে দাম বেশি মনে হলেও আমাদের দিকটাও দেখতে হবে। একদম কমে গরু বিক্রি করলে তো লাভের টাকাটাও উঠবে না।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আমুলিয়া হাটে জনতা ব্যাংকের জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ বসানো হয়েছে। বুথে দায়িত্বরত ব্যাংক কর্মকর্তা হাসিব উদ্দিন তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্রেতা ও বিক্রেতারা সেখানে টাকা জাল কি না পরীক্ষা করতে আসছেন। কেউ চাইলে টাকা গুনেও নিতে পারছেন। এখন পর্যন্ত হাটে কোনো জাল টাকা ধরা পড়েনি। তবে কয়েকজন সন্দেহজনক কিছু নোট নিয়ে এলেও সেগুলো পরীক্ষা করে আসল পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের লেনদেনের সুবিধার্থে বসেছে ওয়ান ব্যাংকের বুথ। যেখানে গ্রাহকদের নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, আরটিজিএস-বিএফটিএনের মাধ্যমে টাকা লেনদেন, গণনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং অপারেশন ইনচার্জ ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এনপিএসবি ও আরটিজিএসের মাধ্যমে টাকা অন্য ব্যাংকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। কারও ক্যাশ টাকার প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা করছি। এ সেবাগুলো ওয়ান ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকের গ্রাহকরাও পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই আমরা সর্বনিম্ন ডকুমেন্ট নিয়ে অ্যাকাউন্ট করে দিচ্ছি। এখন তথ্য দিয়ে গেলে ঈদের পর ব্যাংক খোলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভ ও টাকা জমা হয়ে যাবে।

ধোলাইখাল গরুর হাটে দাম ঊর্ধ্বমুখী : রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখাল গরুর হাটে দুই কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এ হাটে সারি সারি গরু, বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর মানুষের কৌতূহলী ভিড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে হাট শুরু হলেও এখনো পুরোপুরি জমেনি ক্রেতার সমাগম। তা ছাড়া পশুর দামও ঊর্ধ্বমুখী।

সরেজমিন হাট ঘুরে দেখা যায়, বিক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও ক্রেতাদের চাপ এখনো সীমিত। যারা আসছেন, তাদের অনেকেই মূলত বাজার যাচাই করছেন। কেউ গরুর দাঁত দেখে বয়স বোঝার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ শরীরের গঠন ও স্বাস্থ্য দেখে দাম আন্দাজ করছেন। অনেককে মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে কিংবা ভিডিওকলে গরু দেখাতে দেখা গেছে।

তবে গরু দেখতে এসে শুধু কেনাকাটার আগ্রহ নয়, কৌতূহলও প্রকাশ করছেন অনেকেই। বড় আকৃতির বা বাহারি গরুর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। তরুণদের কেউ কেউ বন্ধুদের নিয়ে গরুর পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছেন, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার জন্য ভিডিও ধারণ করছেন। এতে হাটে এক ধরনের আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

গরু বিক্রেতা রবিউল ইসলাম বলেন, এখনো ক্রেতা খুব বেশি না। মানুষ সাধারণত শেষের দিকে আসে। কারণ আগে কিনলে ঢাকায় গরু রাখার জায়গা পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া খাবার দেওয়া, দেখাশোনা সবকিছুই ঝামেলার বিষয়।

তিনি বলেন, এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি। কারণ খড়, ভুসি, খৈল, কাঁচা ঘাস সব খাবারের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া পরিবহন খরচ ও শ্রমিক খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই কম দামে বিক্রি করা কঠিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত