ক্যাম্প উদ্বোধনের আগেই গুঁড়িয়ে দিল সন্ত্রাসীরা

আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর একটি নির্মাণাধীন ক্যাম্প উদ্বোধনের আগেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গত রবিবার রাতে সন্ত্রাসী বাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে আক্রমণ চালায় ক্যাম্পটিতে। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ক্যাম্প উদ্বোধন করবেন বলে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা যৌথ বাহিনীর সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। আক্রমণের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ ঘটনার পর যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ৩০ জনকে আটক করেছে। সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া দুইটি মোটরসাইকেল, দুইটি এক্সকাভেটর ও একটি ট্রাক জব্দ করেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, স্থানীয় সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরাই গত রবিবার রাতে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল সোমবার দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৭।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা র‌্যাবের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকলে র‌্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়েন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাড়তি ফোর্স যেতে না পারে সে লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দেয় সন্ত্রাসীরা। এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে পৌঁছে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করেছে। ঘটনাস্থল থেকে একপর্যায়ে কিছু সন্ত্রাসী পালিয়ে গেছে, কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, ‘জঙ্গল সলিমপুরের মেইন সড়কের ৩-৪ জায়গায় সন্ত্রাসীরা রাস্তা কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে হামলা শুরু করে। সীতাকু- থানা থেকে পুলিশ দ্রুত মুভ করে। কিন্তু ততক্ষণে হামলাকারীরা আলীনগরে নতুন নির্মিত ক্যাম্পের দিকে চলে যায়। সেখানে আক্রমণ করে। নতুন এই ক্যাম্পটার ওপর সন্ত্রাসীদের যথেষ্ট ক্ষোভ ছিল।’

সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে নানা রহস্য ও ভীতি কাজ করলেও, চলতি বছরের শুরুতে নতুন করে সারা দেশে আলোচনায় উঠে আসে। গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের ওপর সশস্ত্র হামলায় এক র‌্যাব সদস্য নিহতের পর থেকেই এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এই প্রেক্ষাপটে ৯ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের প্রায় ৪ হাজার সদস্য যৌথ অভিযান চালায় জঙ্গল সলিমপুরে। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে পরিচালিত এ বিশেষ অভিযানে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭টি পাইপগান, ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলিসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি ২২ জনকে আটক করা হয়।

এরপর গত ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা দাবি করেন, ‘বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই আমরা সেখানে অভিযান সম্পন্ন করেছি এবং জঙ্গল সলিমপুর এখন পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

প্রশ্ন উঠেছে, ভয় আর আতঙ্কের এ জনপদকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো কতটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা কওে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে জঙ্গল সলিমপুরে ঘাপটি মেরে থাকা সন্ত্রাসী বাহিনী।

জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে কেন এত আলোচনা : চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ৩ হাজার ১০০ একর বিস্তৃত এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হলো জঙ্গল সলিমপুর। এটি সরকারি খাসজমি হলেও গত কয়েক দশক ধরে এখানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল জনবসতি।

এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে, যেখানে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস। এদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষ।

এলাকাটি স্থানীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। স্থানীয় প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এখানকার বাসিন্দাদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র ইস্যু করেছিল সন্ত্রাসীরা, যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। দুই পাশে পাহাড় এবং মাঝখানে সরু রাস্তা এলাকাটিকে অনেকটা দুর্গের মতো সুরক্ষা দেয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলেই সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারত না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি ও খুনাখুনির ঘটনা ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকে বন বিভাগের কর্মচারী আলী আক্কাস এখানে বসতি স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও পরে তা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়।

দীর্ঘকাল ধরে ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর চলতি বছরের শুরুতে আলোচনায় আসে। গত ১৯ জানুয়ারি কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সেখানে হামলার শিকার হয় র‌্যাব-৭ এর একটি দল। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০-৫০০ সশস্ত্র লোক র‌্যাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই হামলায় র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।

গত ৯ মার্চ যৌথ অভিযানের আগ পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ‘ইয়াসিন গ্রুপের’। এই গ্রুপের সদস্যরাই র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এলাকায় সক্রিয় রয়েছে আরও দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ: রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ছিল মশিউর-গফুর গ্রুপের হাতে। এরপর তা চলে যায় রোকন গ্রুপের হাতে। ইয়াসিন গ্রুপ সম্প্রতি রোকন গ্রুপকে সরিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া এবং মাদক ব্যবসার মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। এসব অপরাধমূলক কর্মকা-ে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় জঙ্গল সলিমপুরে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে পার পেয়ে যেত। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরও সহায়তা নিত। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য জঙ্গল সলিমপুরে পৌঁছার আগেই সন্ত্রাসীদের কাছে খবর পৌঁছে যেত।

 

হামলা সম্পর্কে যা জানা গেল : গতকাল সোমবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে খেজুরতলা এলাকায় দুই স্থানে, এর আধা কিলোমিটার দূরে পাথরিঘোনা এলাকা এবং আরও এক কিলোমিটার পরে আলীনগর চৌরাস্তার মোড়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। সেখানে পথচারীদের হেঁটে পারাপারেও যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।

আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে আগে ৫০ গজের মতো গেলে যৌথ বাহিনীর নতুন সার্বক্ষণিক ক্যাম্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল। পাকা পিলারের সঙ্গে চারদিকে টিনের ঘেরা দিয়ে ক্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়।

পুলিশ জানায়, গত ১ মে থেকে ক্যাম্পটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ করে আগামীকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিদায় নেওয়ার কথা ছিল। ক্যাম্পটিতে প্রতি শিফটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন র‌্যাব, জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের ৫ জন করে সদস্য মিলে ১৫ জন। নির্মাণশ্রমিকদের ক্যাম্পের সামনেই খালি একটি দোকানের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তব্যরত এক সদস্য বলেন, ‘রাত ১টার পর হবে। হঠাৎ দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমরাও গুলি ছুড়তে ছুড়তে দক্ষিণ দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু উত্তর ও পূর্বদিক থেকে শত শত সন্ত্রাসী গুলিবর্ষণ করতে করতে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমরা অস্ত্রধারীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাই। তখন প্রাণভয়ে যে যেদিকে পেরেছি, সেদিকে চলে যাই।’

স্থানীয় একজন দোকানদার বলেন, ‘আমরা সাতজন ছিলাম। দোকানের ভেতর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। প্রথমে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি শুরু হয়। তারপর দুই দিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সন্ত্রাসীরা আসতে থাকে। মোটরসাইকেলেও কয়েকজন আসে। অনেকের হাতে পিস্তল আর কিরিচ ছিল। ট্রাক আর এক্সকাভেটরও নিয়ে আসে। কয়েকজন সন্ত্রাসী দোকানের ভেতরে ঢুকে আমাদের মারধর করে ৪০ হাজারের মতো টাকা আর সবার মোবাইলগুলো নিয়ে চলে যায়।’

এদিকে, কিছু দিন আগে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারের শাখা, মডেল মসজিদসহ বেশ কিছু সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত