পরিবহন সেক্টরের আধুনিকায়নে সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। দেশে বিমান, বাস, লঞ্চ সেক্টরে বেসরকারি বিনিয়োগ আছে। কিন্তু রেল সেক্টরে নেই। রেলে বেসরকারি বিনিয়োগ আনতে চায় সরকার। এতে করে রেল দুর্নীতিমুক্ত হবে। প্রতিযোগিতা বাড়বে। প্রতিযোগিতা বাড়লে যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে। সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
হাবিবুর রশিদ হাবিব রেলের উন্নয়ন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহারসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘পরিবহন সেক্টরে বিমান, বাস, লঞ্চে বেসরকারি বিনিয়োগ আছে। কিন্তু রেলে বেসরকারি বিনিয়োগ নেই। তাই সরকার চাইছে রেলে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে।’
হাবিব বলেন, ‘রেলওয়ের লাইন, সিস্টেম ও প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে শুধু লোকোমোটিভ (স্বচালিত রেলযান) ও কোচ পরিচালনায় বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ব্যাপারে সরকারের চিন্তাভাবনা রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা গেলে লোকোমোটিভ এবং কোচ আমদানির সময় সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব হবে। রেলের সমস্যাগুলো দূর করতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। মূল টার্গেট হচ্ছে আমাদের বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে যাত্রীসেবা সুনিশ্চিত করতে চাই, নিরাপদ করতে চাই। পাশাপাশি যেখানে যে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতি রয়েছে সেগুলোা চিহ্নিত করে তার একটি সুষ্ঠু সুন্দর সমাধান দিতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে চলছি।’
তিনি বলেন, ‘সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে (বিআরটিসি) শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই। মহিলাদের জন্য বিআরটিসির বাস চালু করতে চাই। এসব বাসে মহিলাচালক ও মহিলা কন্ডাক্টর থাকবে। পাশাপাশি সড়কে গণপরিবহণ উন্নত করতে ও পরিবেশদূষণ কমাতে রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চালু করতে চাই। আগে এক্ষেত্রে শুল্ক ছিল ৬২ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১৫ শতাংশ করা হবে। এর ফলে সড়ক পরিবহন মালিকরা পুরনো বাসগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন ইলেকট্রিক বাস আনতে উৎসাহিত হবে। ইলেকট্রিক বাস আমদানি হলে জ¦ালানি তেলের ওপর চাপ কমবে। এ ছাড়া ইলেকট্রিক বাস বাড়লে ব্যাটারিচালিত পরিবহনের সংখ্যা কমে আসবে। আমাদের মূল টার্গেট হচ্ছে সড়ককে নিরাপদ করা এবং উন্নত বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা আনতে এবং যাত্রীসেবা উন্নত করতে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকগুলো এগিয়ে এলে গণপরিবহন সেক্টরের আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বাস মালিক ও শ্রমিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি সেক্টরের পাশাপাশি রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে উৎসাহিত করতে সরকার কাজ করছে। ব্যবসায়ীদের জন্য শতকরা ১৫ শতাংশ ট্যাক্স ধরা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিনাশুল্কে এই বাস আনতে পারবে।’
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা বা এআইভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার সড়কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে. সনাতন বা ম্যানুয়াল ট্রাফিক ব্যবস্থার পরিবর্তে এই আধুনিক প্রযুক্তি আইন অমান্যকারীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে, যা চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছে। ফলে রাজধানীর সড়কে ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে গণপরিবহনে জিপিএস বসানো হবে, যাতে করে বাসের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি সিগনালিং ব্যবস্থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আওতায় আনা হচ্ছে। প্রথমে রাজধানী ঢাকায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় পরিবহন সেক্টরে দুর্নীতি কমবে। এভাবে সব পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করে দুর্নীতি কমিয়ে আনা হবে।’
রেলের আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ট্রেনে যাত্রীরা যাতে নির্বিঘেœ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ট্রেনে রাউটার বসানো হচ্ছে। যাত্রীসেবা উন্নত করা হবে। রেলের যে ওয়ার্কশপগুলো আছে তার আধুনিকায়ন হবে। লেভেল ক্রসিংগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। রাজধানীর এয়ারপোর্ট রেল স্টেশনের পরিত্যক্ত জায়গায় যাত্রীদের জন্য আরেকটি ওয়েটিং স্পেস করা হবে। যেখানে দুই-চারশ যাত্রী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে পারবে। যানজট কমাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে করে গণপরিবহনে যাতায়াত করা যাত্রীদের সময় বাঁচবে।’
ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে তাৎক্ষণিক টিকিট ব্যবস্থা, অতিরিক্ত কোচ সংযোজন, স্টেশনভিত্তিক যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ, ওয়েটিং স্পেস বৃদ্ধি, ট্রেনের সময়সূচি সমন্বয় এবং লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের মতো নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী হাবিব।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সবসময় সমস্যার সৃষ্টি করে। এরা নির্দেশনা মানে না। এদের শৃঙ্খলায় আনার জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের সে সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়ক ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। আগে এসব বিষয় দেখার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট ছিল ২০ জন। এবার আমরা ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েছি ৫০ জন। প্রয়োজনে জরিমানা করার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধান সড়কে যাত্রী তোলা যাবে না। বিআরটিএর মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হবে এসি ও নন-এসি বাসের। কাউন্টারের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করতে হবে। এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করা হবে। একেক কোম্পানি একেক রকম ভাড়া নিতে পারবে না। একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে যার রঙ থাকবে একই। নীতিমালা করে দেওয়া হবে যা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা মেনে চলবে। বিআরটিএ বাসের রোড পারমিট ও ফিটনেস দেখবে। কোথাও কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সরকার ব্যবস্থা নেবে।’
রেলের কালো বিড়াল ধরার বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে রেল প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে রেল সেক্টরে দুর্নীতি হয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ভবিষ্যতে দুর্নীতি দমনের বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে। রেলের কেনাকাটা থেকে শুরু করে সব টেন্ডার প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করা হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মোট কথা সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা হবে।’