টাঙ্গাইলে ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ জনের মৃত্যু

আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ০৭:১১ এএম

ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রডবোঝাই একটি ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ৯ জন। গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা সবাই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। তারা ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরছিলেন। বাসে ভাড়া বেশি চাওয়ায় তারা কম টাকায় চট্টগ্রাম ও ফেনী থেকে ট্রাকে ওঠেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা। তারা নোয়াখালীতে ফেরি করে পণ্য কেনাবেচা করতেন।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহতরা সবাই ঢাকা থেকে আসা রডবোঝাই ট্রাকের যাত্রী ছিলেন। তারা উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিলেন। সরাতৈল এলাকায় পৌঁছালে ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে উল্টে যায়। দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাকটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আহত ৯ জনকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহতরা হলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের মো. সুলতানের ছেলে মোহাম্মদ তারেক (২১), মো. আব্দুর রহিমের ছেলে মোহাম্মদ বাদশা (৩০), মো. আব্দুর রশিদের ছেলে মো. আব্দুল বারেক (২০), একাব্বরের ছেলে মো. সোহাগ (২১), মো. শহিদুলের ছেলে মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম (২৮) ও মোহাম্মদ সাকিমের ছেলে মোহাম্মদ সাগর মিয়া (২০)। এ ছাড়া মুর্শিদপুর গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম (৩৫), পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ মাইনুল (২৫) ও মোহাম্মদ গিয়াস (২২) এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রামগা এলাকার রহমতুল্লার ছেলে আলমগীর হোসেন সুজন (২৪)।

নিহত অন্যরা হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চরপাকা এলাকার মৃত সহিমুদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর এলাকার ফহিমুদ্দীনের ছেলে মামুন (৪০); রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাতাসপুর এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (২৫), কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বৈরাগীরচর এলাকার হাবিবুর রহমান প্রামাণিকের ছেলে হাসান আলী (৩৯) ও নাটোরের লালপুর উপজেলার নরেন্দ্রপুর এলাকার ইব্রাহিম মোল্লার ছেলে মোহাম্মদ আলম মোল্লা।

আহতরা হলেন মান্দার ডেমরা গ্রামের মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫), হোসেনপুর গ্রামের আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), নাটোরের মৃত মান্নানের ছেলে নয়ন বিশ্বাস (৩২), আলমগীর (৪০), সিদ্দিক আলী (৪০), খোরশেদ (২৬), ছোরহাব আলী, তুহিন ও সমেজ।

এলেঙ্গা ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ আতাউর রহমান জানান, সোমবার ভোর ৪টা ৫ মিনিটে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। আমরা গিয়ে দেখি ট্রাকটি উল্টে পড়ে আছে। ট্রাকটি রডবোঝাই ছিল। ওই রডের ওপর যাত্রীরা বসে ছিলেন। জীবিতদের ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি, ট্রাকটিতে ২৫-২৬ জন যাত্রী ছিলেন। এদের কয়েকজন ছিটকে পড়ে ও আহত হন। বাকি ২১ জন রডের নিচে চাপা পড়েন। স্থানীয় ও পুলিশের সহযোগিতায় ট্রাকের নিচ থেকে সবাইকে বের করা হয়। কিন্তু উদ্ধারকৃতদের ১৫ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাদের মরদেহ যমুনা সেতু পূর্ব থানায় হস্তান্তত করা হয়েছে এবং আহতদের টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আতাউর রহমান আরও জানান, ওই ট্রাকের প্রায় সবার বাড়ি নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়। দুর্ঘটনার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। হতে পারে যে ড্রাইভার হয়তো ঘুমাচ্ছিল বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল।

ট্রাকের বেঁচে যাওয়া যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, ট্রাকটি নওগাঁর মান্দা উপজেলা যাবে। আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অলংকার থেকে উঠেছিলাম। মূলত বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৭শ থেকে ১৮শ টাকা চাওয়া হয়। কম টাকার জন্য আমরা ট্রাকে উঠি। আমরা চারজনে ২৩শ টাকা দেই। আমার দুজন মারা গেছে।

নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন জানান, তারা নোয়াখালী এলাকায় ফেরি করে মানুষের ফেলে দেওয়া চুল, ভাঙা মোবাইল ও প্লাস্টিকের খেলনা বেচাকেনা করত। ঈদের ছুটিতে সবাই মিলে একসঙ্গে বাড়ি আসছিল। বাসে ১৮শ টাকা ভাড়া চেয়েছিল, পরে আরও কম টাকায় সবাই মিলে ট্রাকে ওঠে। ফেনী থেকে তারা ট্রাকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এ সামান্য টাকার জন্য সব শেষ হয়ে গেল।

একই ইউনিয়নের ৯ যুবকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে ভাঁরশো ইউনিয়নসহ পুরো মান্দা উপজেলা শোকে স্তব্ধ। নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি। উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা ও স্বজনরা। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে উদ্ধার কাজের কারণে ভোর সাড়ে ৪টা থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ ছিল। পরে সেতু পূর্ব ভূঞাপুর লিংক রোড দিয়ে ঢাকাগামী এবং পুরনো সড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়নি।

যমুনা সেতু পূর্ব থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানি জানান, পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত