২৮০ কোটিতেও সারেনি ক্ষত

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ গত ১৩ বছরেও শেষ হয়নি। খানাখন্দ, ধুলাবালি আর খোঁড়াখুঁড়িতে বিধ্বস্ত এই সড়কটি এখন জনদুর্ভোগের আরেক নাম। স্থানীয়রা প্রায় চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই সড়ককে ‘খুলনার লজ্জা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৩ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি, উল্টো প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে আকাশচুম্বী। সড়কের কাজ শেষ করতে এখন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) নতুন করে টেন্ডার (দরপত্র) আহ্বান করেছেন।

জানা যায়, এই সড়কের বেহাল অবস্থার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময় নাগরিক কমিটি মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং ব্যতিক্রমী সব কর্মসূচি পালন করেছে। ২০২৫ সালে ৩ সেপ্টেম্বরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর মহানগর কমিটি শিপইয়ার্ড সড়কের খানাখন্দে অংশে ধানের চারা রোপণ করে প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।

শিপইয়ার্ড সড়কের কাঠ ব্যবসায়ী সুমন বলেন, ‘বর্তমানে সড়কটির অবস্থা ভয়াবহ। কাদা ও খানাখন্দে ভরা এই সড়কে ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে খুলনা শিপইয়ার্ড, নৌবাহিনীর স্থাপনা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও বছরের পর বছর ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় আছে।’

স্থানীয় গ্যারেজ মালিক কালাম শেখ বলেন, ‘এই সড়কে রিকশা উল্টে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। রূপসা নদীর জোয়ারের পানিতে রাস্তা তলিয়ে যাচ্ছে।’

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০১৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২০ সালে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রকল্প ব্যয় তিন গুণ বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়া এবং নকশা পরিবর্তনের অজুহাতে তৃতীয় দফায় প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় ধরা হয় ২৮০ কোটি টাকা। সাত বছর কেটে যায় ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায়। ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আতাউর রহমান লিমিটেড অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে (জয়েন্ট ভেঞ্চার)’ সড়কের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

কেডিএ জানিয়েছে, খুলনা রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে রূপসা সেতু পর্যন্ত শিপইয়ার্ড সড়কটির দৈর্ঘ্য ৩.৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬০ ফুট। সড়কের দুপাশে ৬ হাজার ৬০০ মিটার ডিপ ড্রেন, একটি সøুইস গেট, একটি কালভার্ট, ডিভাইডারসহ বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যবস্থা রাখার কথা রয়েছে। ২০২২ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের রেট সিডিউল মোতাবেক প্রকল্প ব্যয় ২৮০ কোটি ৭১ লাখ করা হয়, কিন্তু কাজ অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ৭০ কোটি টাকা তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় গত বছরের ৭ আগস্ট মাহাবুব ব্রাদার্সের সঙ্গে কাজের চুক্তি বাতিল করে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদালতে মামলা করায় কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এতে মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় সড়ক সংস্কার, লবণচরা সেতু ও মতিয়াখালী সøুইস গেটের নির্মাণ কাজ।’

কেডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. সাবিরুল আলম বলেন, ‘আগের ঠিকাদারের কাজের গাফিলতির কারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক চুক্তি বাতিল করে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। বুধবার (আজ) টেন্ডার জমা দেওয়ার শেষ দিন। আগের ঠিকাদার ইতিমধ্যে ৭১ কোটি টাকার কাজ করেছে, সেই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।’

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) প্রকল্প পরিচালক আরমান হোসেন বলেন, ‘নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে এ বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে।’

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

খুলনা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সড়কটি ৪ লেনে প্রশস্ত করে পুনর্নির্মাণ, দুই পাশে ড্রেন ও ফুটপাত, সড়কের মাঝে ৯২ মিটার ডিভাইডার নির্মাণ, লবণচরায় ৬৬ মিটার দৈর্ঘ্যরে সেতু নির্মাণ এবং মতিয়াখালীতে সøুইস গেট ও কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল। ইতিমধ্যে ঠিকাদার ৭০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আমি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে অনুরোধ করছি। তা না হলে খুলনার গণমানুষ রাজপথে নামবে।’

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু সড়কটি পরিদর্শন করে এটিকে ‘খুলনাবাসীর কান্না’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘দ্রুত কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। নতুন করে দরপত্র আহ্বানও করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সড়কটি পরিদর্শন করেছেন। আশা করা হচ্ছে, এবার কাজ দ্রুত শেষ হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত