অসুস্থতায় গ্রাম্য চিকিৎসক কবিরাজ ঝাড়ফুঁকই ভরসা

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর চরাঞ্চলে জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট হলেই যেন জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলে। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব, বন্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সামান্য অসুস্থতায় অনিশ্চয়তায় পড়তে হয় চরের দুই লাখ বাসিন্দাকে। বাধ্য হয়ে তাদের গ্রাম্য চিকিৎসক, কবিরাজ ও ঝাড়ফুঁকে ওপর ভরসা করতে হয়। রাঙ্গাবালীকে উপজেলা ঘোষণার ১৪ বছর পার হলেও এখানে স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক সংকট কাটেনি। তিন দিকে নদী ও একদিকে বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন এ জনপদের ছয় ইউনিয়নের মধ্যে চারটিই উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় দুই লাখ বাসিন্দা। অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার জন্য নদী পেরিয়ে গলাচিপা, কলাপাড়া কিংবা জেলা সদরে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ট্রলার কিংবা স্পিডবোটই একমাত্র ভরসা। ফলে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাঙ্গাবালী উপজেলার নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও উপজেলা হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হয় প্রায় ১১ বছর আগে। কিন্তু সেখানে স্থাপিত হয়নি একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণকাজ শুরু হলেও এখনো তা শেষ হয়নি। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মাধ্যমে রাঙ্গাবালীর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলায় একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ। সরকারি নথি অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে পাঁচজন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। কিন্তু সব পদই শূন্য। চালিতাবুনিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকসহ পাঁচটি পদের মধ্যে আছেন মাত্র দুজন। ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার পর তারা অন্যের বাড়ির আঙিনায় বসে সেবা দিচ্ছেন। অন্যদিকে, চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের চারটি মেডিকেল অফিসারের পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।

এদিকে, লোকবল সংকটের কারণে চর মোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র কার্যত বন্ধ। অন্য তিনটি কেন্দ্রে কেবল উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা সীমিত পরিসরে চিকিৎসা দিচ্ছেন। জরুরি ওষুধেরও রয়েছে তীব্র সংকট। বিশেষ করে পরিবারপরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে।

ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সী শাহনাজ বেগমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাঁপানি রোগে ভুগছেন। চিকিৎসা নিতে এসে দেখেন বড় কোনো ডাক্তার নাই। তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ। পটুয়াখালী যাইয়া ডাক্তার দেহাইতে অনেক টাকা খরচ অইবে। এই জায়গায় একজন ডাক্তার থাকলে হেরে দেহাইতে পারতাম।’

চর মোন্তাজের বাসিন্দা মহিউদ্দিন হাওলাদার ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। তার স্ত্রী ইছামতি বেগম জানান, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য ট্রলারে করে গলাচিপা যেতে অন্তত চার ঘণ্টা সময় লাগে। অর্থের অভাবে অনেক সময় চিকিৎসাও করানো সম্ভব হয় না। একই এলাকার জাকির হোসেন বলেন, রাতে মেয়ের সারা শরীর জ্বরে পুড়ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার উপায় ছিল না। নিরুপায় হয়ে কবিরাজের ওপর ভরসা করতে হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার অধিকাংশ মানুষ জেলে ও কৃষিজীবী। আর্থিক সংকট ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেকেই অসুস্থ হলে ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ বা গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলা পরিবারপরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসক, জনবল, ওষুধ-সব ক্ষেত্রেই সংকট রয়েছে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, আবাসন সুবিধা না থাকায় চিকিৎসক রাখা কঠিন হচ্ছে। দুর্গম চরাঞ্চলে সপ্তাহে দুই দিন চিকিৎসক পাঠিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায় কিনা, তা ভাবা হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ হলে সংকট অনেকটা কমে আসবে বলে জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত