৬ দিন নিখোঁজ, সবাই ভেবেছিল মৃত—এভারেস্টে ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০২:০০ এএম

হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ছয় দিন পর অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন দাওয়া শেরপা নামে এক নেপালি গাইড। তীব্র প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পকেটে থাকা সামান্য কিছু চকলেট খেয়ে এবং ‘বরফ চিবিয়ে’ তিনি বেঁচে ছিলেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন।

৫৭ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গাইড জানান, এভারেস্ট থেকে নামার সময় তিনি ‘নিখোঁজ’ হননি, বরং অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পেছনে পড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।

দাওয়া শেরপা পর্বত থেকে আর জীবিত ফিরবেন না- এমনটা ধরে নিয়ে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে তাঁর পরিবার ইতিমধ্যে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করে দিয়েছিল। তবে গত বৃহস্পতিবার এভারেস্টের বেস ক্যাম্পের দিকে বরফের ওপর দিয়ে ‘গড়িয়ে গড়িয়ে’ নেমে আসার সময় একটি পরিচ্ছন্নতাকর্মী দলের চোখে পড়েন তিনি। এরপরই তাঁকে উদ্ধার করে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানে তিনি পানিশূন্যতা, ফ্রস্টবাইট (তীব্র ঠান্ডায় চামড়া ও টিস্যু জমে যাওয়া) এবং হাড়ের ফাটলের চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন দাওয়া শেরপা শুক্রবার বিবিসি নেপালিকে বলেন, ‘আমি ভাবিনি বেঁচে ফিরব। ভেবেছিলাম এভাবেই বুঝি আমার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে।’

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দাওয়া শেরপা জানান, পর্বত থেকে নামার সময় অক্সিজেন শেষ হয়ে গেলে তিনি আর হাঁটতে পারছিলেন না। প্রথম দুই দিন তিনি কিছুই খাননি। এরপর তৃষ্ণা ও ক্ষুধা মেটাতে বরফ চিবানো শুরু করেন, যা তাঁর দাঁতে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করছিল। পরে পকেটে কিছু চকলেট খুঁজে পান এবং বরফ গলিয়ে পানি খাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামার সময় তিনি একপর্যায়ে একটি ‘ক্রাভাস’ বা হিমবাহের গভীর ফাটলে পড়ে যান। সেখানে টানা আড়াই দিন কোনো উপায় না পেয়ে আটকে ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ওপর থেকে ধসে পড়া একটি বরফখণ্ড (অ্যাভালাঞ্চ) ওই ফাটলের ভেতর পড়লে তাঁর মনে আশার আলো জাগে। ধসে পড়া বরফের স্তূপের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি ওপরের দিকে তাকান এবং বুঝতে পারেন যে ফাটল থেকে বের হওয়া সম্ভব।

কষ্টে ফাটল থেকে বের হওয়ার পর কাছাকাছি কিছু দড়ি খুঁজে পান, যার সাহায্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ থেকে নিচে নামতে শুরু করেন তিনি। পথে আরও একটি তুষারধসের মুখে পড়লেও দমে যাননি দাওয়া। সারা রাত হেঁটে অবশেষে বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছালে আবর্জনা সংগ্রহ করতে যাওয়া একদল যুবকের দেখা পান এবং তাঁরাই তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

উদ্ধার হওয়ার আগে বৃহস্পতিবার খুম্বু আইসফলের কাছে দাওয়া শেরপাকে সর্বশেষ জীবিত দেখেছিলেন ব্রিটিশ সাবেক সেনা ও পর্বতারোহী ক্রিস থ্রাল। তিনি জানান, ক্যাম্প-৩-এর ঠিক ওপরে (প্রায় ৭,৫০০ মিটার উচ্চতায়) দাওয়াকে তাঁর ব্যাকপ্যাকের ওপর বসে বিশ্রাম নিতে দেখেছিলেন।

ক্রিস থ্রাল জানান, তিনি আরও ১০০ মিটারের মতো নিচে নামার পর তাঁদের দলের এক পোলিশ পর্বতারোহীকে তীব্র ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত ও অক্সিজেনহীন অবস্থায় দেখতে পান। তখন তিনি ওই দুর্বল পর্বতারোহীকে সাহায্য করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ওপরের দিকে তাকিয়ে দাওয়ার কোনো নড়াচড়া বা তাঁর হেড টর্চের আলো দেখতে না পাওয়ায় ধরে নেওয়া হয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাওয়ার বেঁচে থাকার খবর দেখে প্রথমে এটিকে ভুয়া বা ‘স্প্যাম’ মনে হয়েছিল বলে জানান থ্রাল। তিনি বলেন, ‘এক মুহূর্তে আমরা তাঁর মেয়ের সঙ্গে কাঁদছিলাম, আর পরের মুহূর্তেই শুনলাম তিনি হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে আসছেন। এটি অবিশ্বাস্য, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

দাওয়া শেরপার স্ত্রী দামু শেরপা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম তিনি আর নেই এবং শেষকৃত্যের কাজও শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতালে যখন তাঁর ছবি দেখলাম, তখন আমার বুনা টুপিটি দেখেই তাঁকে চিনতে পারি। আমি ভীষণ অবাক হয়েছি।’

দাওয়ার মেয়ে হেন্দো লামো শেরপা রয়টার্সকে বলেন, ‘বাবা আমাদের চিনতে পেরেছেন এবং কথা বলছেন। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’

সার্চ অপারেশন তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা ‘৮কে এক্সপেডিশনস’-এর নির্বাহী পরিচালক পেম্বা শেরপা এই ঘটনাকে ‘সত্যিকারের আত্মরক্ষা’ ও এক ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন। কাঠমান্ডুর হ্যামস হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকলেও বর্তমানে দাওয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং পানিশূন্যতার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯২০ সালের পর থেকে এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৩০০ জনেরও বেশি পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে চলতি মৌসুমেই মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। তবে এবারের মৌসুমে ১,০০০-এরও বেশি আরোহী এভারেস্ট জয় করেছেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত