‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।’
জসীম উদ্দীন (মামার বাড়ি কবিতা)
গ্রীষ্মকাল এলেই মনে পড়ে কবি জসীম উদ্দীনের ‘মামার বাড়ি’ কবিতাটির কথা। আহ্, গরমকালের ছুটিতে মামাবাড়ি যাওয়ার কত না আনন্দ ছিল। ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতার মতো পাকা জামের মধুর রসে মুখ রঙিন করতে মন চায়। কিন্তু সে সুযোগ গ্রামে থাকলেও ঢাকা শহরে কম। ঢাকায় জামগাছ খুব কমই দেখা যায়।
বৈশাখের শেষে তপ্ত দুপুরে রোদ ঢালছে আকাশ। মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ভেতর সেই রোদে ভিজে ভিজে গাছপালা দেখছি, পোকামাকড় খুঁজছি আর ছবি তুলে বেড়াচ্ছি। গরমের মধ্যেও গাছপালার ছায়া যেন মায়ের আঁচল উড়িয়ে হাওয়া দিচ্ছে। ছায়া সরলেই রোদের হল্কা এসে লাগছে চোখে মুখে। উদ্যানের ভেতর একটা দীর্ঘ পথ, দুপাশে লম্বা দেবদারুগাছের সারি। সে পথেই হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়ল জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা জামগাছের দিকে।
জামগাছের ডালপালাগুলো যেন নতুন বউয়ের মতো গয়না পরে সেজেছে, ফুলের গয়না। সমস্ত ডালপালায় ফুলের ছড়াছড়ি আর মৌমাছিদের মাখামাখি। আহ্, কি সুমিষ্ট সৌরভ আসছে গাছগুলো থেকে। সে আকর্ষণে কাছে যেতেই থোকায় ধরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাম ফুলগুলো দেখে মনটা ভরে গেল। এত নিবিড়ভাবে জামফুল দেখা হয়নি কখনো। ফুল থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই থোকায় থোকায় ফল ধরবে। তারপর সেগুলো পেকে বনের পাখিদের আহার হবে। আমরাও সে আহারে ভাগ বসাব। মনে পড়ছে, ছোটবেলায় পাকা জামের মধুর রসে কত বার যে মুখ রাঙিয়েছি! শুধু কি মুখ? জিহ্বাটাও হয়ে গেছে বেগুনি নীল। কমপাকা জামের বিপদও আছে। কইষট্যা জামে গলা আটকে তো গলার স্বরটাই অন্যরকম হয়ে যায়।
ছোট ছোট জালের কাঠির মতো জামের ফল। কাঁচা ফলগুলো সবুজ, ডাঁশা ফলগুলো গোলাপি-সবুজ ও পাকা ফলগুলো কালো। এজন্য এ জামকে বলে ‘কালোজাম’। এ দেশে জামের আকৃতির একটা মিষ্টি বানানো হয়, তাকেও বলে কালোজাম। এ দেশে অন্তত বারো রকমের জাম আছেখুদিজাম, ভুতিজাম, পুঁতিজাম, পেতিজাম, পাইন্যাজাম, নলিজাম, বুটিজাম, কাকজাম, সাদাজাম, লুভিজাম, হামজাম, গোলাপজাম ইত্যাদি।
মির্টেসী গোত্রের কালোজাম (ঝুুমরঁস পঁসরহর) গাছ বৃহদাকারের চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী বৃক্ষ, প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বাকল ধূসর-বাদামি ও খসখসে। পাতা সরল, বড়, পুরু ও চকচকে। মার্চ-এপ্রিলে ফুল আসে। জামের ফুল ছোট, ঘিয়া রঙের ও তারাবাজির মতো দেখতে, সুমিষ্ট ঘ্রাণযুক্ত। শাখায়িত পুষ্পমঞ্জরিতে প্রচুর ফুল ফোটে। ফুলে বেশ মধু থাকে যা খেতে অনেক পোকা ছুটে আসে। জামের এতগুলো ফুলের পরাগায়ন তারাই ঘটায়।
জাম গ্রীষ্ম-বর্ষার ফল, মে জুন মাসে ফল পাকে। ফল লম্বাটে ডিম্বাকার। ফল শুরুতে সবুজ থাকে যা পরে গোলাপি হয় এবং পাকলে কালো বা কালচে বেগুনি হয়ে যায়। ফলের গা কালো, খুব মসৃণ পাতলা চকচকে আবরণ দিয়ে ঢাকা থাকে। ফলের বহিরাবরণের ঠিক নিচ থেকেই গাঢ় গোলাপি রঙের টক মিষ্টি রসাল শাঁস থাকে। জাম এ দেশে একটি জনপ্রিয় কাঠের গাছ, পাখিদের আশ্রয় ও আহারের জন্য চমৎকার। ভারতবর্ষেই এ গাছের জন্ম। সেখান থেকে সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে। এ দেশে কালোজামের বেশ কয়েকটা প্রজাতি ও জাত দেখা যায়। কোনোটার ফল ছোট, কোনোটার ফল লম্বা, কোনোটার গোল বা ডিম্বাকার ও বড়। ছোট জামগুলোকে বলে খুদিজাম, বড়গুলোকে বলে ভুতিজাম। কইষট্যা টক জাতের এক প্রকার জাম পাওয়া যায়, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে যাকে বলে কাকজাম।
জামের বীজ দিয়ে ডায়াবেটিসসহ নানান রোগের আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা করা হয়। রোজ জামের বিচির গুঁড়ো জলে গুলে খেলে রক্তের সুগার কমে। হজমের সমস্যা, উচ্চ রক্ত চাপ, মাড়ির প্রদাহ ইত্যাদি রোগে জামের বীজ, ছাল ও পাতা ব্যবহৃত হয়। পাতা ঘন, চকচকে ও গাছ ছায়াঘন চিরসবুজ হওয়ার কারণে একে উদ্যানে কখনো কখনো আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হয়। জামের সে সুনিবিড় ছায়া ছেড়ে যেতে মন চায় না। কবি জীবনানন্দ দাশও সে ছায়া ছেড়ে যেতে আক্ষেপ করেছিলেন‘একদিন ছেড়ে যাবে আম জাম বনে নীল বাংলার তীর,/যার ডাক শুনে আজ খেতে-খেতে করিয়েছে খই আর মৌরির ধান;-।’
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
