বোধসম্পন্ন হওয়ার পর থেকে যাকে ‘মা’ বলে জেনেছেন, যার পরিচয়ে বড় হয়েছেন শহরের অভিজাত পরিবেশে সেই ‘মা’ই জানালেন তিনি তার প্রকৃত মা নন। ১৫ বছর বয়সে মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কিশোরীর মাথায় যেন আকাশ থেকে পড়েছে।
এই নাটকীয় ঘটনাটির জন্ম দিয়েছেন রাজশাহীর স্বনামধন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শিপ্রা চৌধুরী। ডা. শিপ্রার মেয়ে পরিচয়ে বড় হয়েছিলেন ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে বাড়ির আশপাশের সবাই জানতেন পায়েল ডা. শিপ্রার মেয়ে। কিন্তু ২০২২ সালে এসে শিপ্রা চৌধুরী মেয়েটির পিতা-মাতার এই পরিচয় অস্বীকার করছেন। জন্মনিবন্ধন পরিবর্তন করে পিতা-মাতা হিসেবে নিজেদের নাম মুছে দিয়েছে শিপ্রা চৌধুরী। মেয়ে হিসেবে পায়েলকে রাজশাহী শহরে যে জমি উপহার দিয়েছিলেন, সেই জমিও ফেরত নেওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন শিপ্রা। এমন পরিস্থিতিতে এক চরম নাটকীয়তার মুখোমুখি এই কিশোরী। জেসমিন নামের পরিবর্তে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল পরিচয়ে বড় হওয়া মেয়েটির জীবন এখন পড়েছে দুর্বিপাকে।
জানা যায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজে গিয়ে ২০০৮ সালে এক শিশুর জন্মনিবন্ধন করান। নিবন্ধনে শিশুটির নাম ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল। মায়ের নাম ডা. শিপ্রা চৌধুরী। বাবার নাম লেখা হয় শিপ্রা চৌধুরীর স্বামী ডা. ওবাইদুর রহমান চৌধুরীর নাম। সেই পরিচয় নিয়েই বড় হতে থাকেন পায়েল। রাজশাহীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা, শহরের অভিজাত জীবন, চিকিৎসক মায়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ সব মিলিয়ে আর দশটা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতোই বেড়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে সেই পরিচয়ের ভিত্তি।
পায়েলের দাবি, সে সময় ডা. শিপ্রা তাকে জানান, তিনি তার আসল মা নন। তার প্রকৃত বাবা-মা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রাজমিস্ত্রি বাবুল আর মা বাবুলের স্ত্রী টগরী বেগম। এই তথ্য মেনে নিতে পারেননি পায়েল। কারণ, জন্মের পর থেকেই যাদের বাবা-মা হিসেবে জেনে এসেছেন, হঠাৎ করে তাদের অস্বীকার করা তার কাছে অবিশ্বাস্য।
শুধু মৌখিক অস্বীকারেই থেমে থাকেননি ডা. শিপ্রা চৌধুরী। মেয়েটির জন্মনিবন্ধন কার্ডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে ফেলেছেন। ২০২৩ সালে পরিবর্তন করা হয় জন্মনিবন্ধনের তথ্য। সংশোধন করা হয়েছে একাডেমিক কাগজপত্রও। ২০১০ সালে নিজের মেয়ে পরিচয়ে পায়েলের নামে যে জমি দান করেছিলেন ডা. শিপ্রা, সেটিও ফেরত চেয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই জমির দলিলে ডা. শিপ্রা নিজেই পায়েলকে নাবালক সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সংবাদমাধ্যমকে পায়েল বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে উনাদের কাছেই বড় হয়েছি। পরিবারের সদস্য বলতে তারাই ছিল আমার সবকিছু। বাবা আলাদা থাকতেন, ভাইও দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মা। কিন্তু একসময় তার আচরণ বদলে যেতে থাকে। তিনি জানান, আমি তার নিজের মেয়ে নই, পালিত সন্তান। কথাগুলো শুনে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম। কারণ এতদিন যে পরিচয়ে বড় হয়েছি, সেটাই যদি সত্য না হয় তাহলে আমি আসলে কে?’
পায়েলের দাবি, মৌখিকভাবে সম্পর্ক অস্বীকার করার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। যে জন্মনিবন্ধন ‘মা’ নিজেই বানিয়েছিলেন ২০০৮ সালে, সেই জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নথিপত্র তিনি পরিবর্তন করে ফেলেন। কিন্তু কীভাবে এবং কেন পরিবর্তন তা তাকে জানানো হয়নি। এখন পায়েলের এনআইডি কার্ডে এক তথ্য, জন্মনিবন্ধনে আরেক তথ্য, শিক্ষাগত সনদপত্রে আবার ভিন্ন তথ্য। এসব কারণে বিভিন্ন জায়গায় তাকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ও জটিলতা তৈরি হয়। পড়াশোনার এক বছর নষ্টও হয়। এখন পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এ সবের জন্য দায়ী কে?
পায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের দিকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছিল। তারা একসঙ্গে থাকতেন না। একমাত্র পুত্রসন্তানও বাবার সঙ্গে থাকতেন। পরে ২০২২ সালে ডা. ওবাইদুর রহমানের মৃত্যুর পর ছেলের সঙ্গে, ছেলের স্ত্রীর সঙ্গে শিপ্রা চৌধরীর সম্পর্ক কিছুটা ভালো হয়। যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়। এর পর থেকেই ডা. শিপ্রা চৌধুরী বদলে যান। তার সঙ্গে রুক্ষ আচরণ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে মেয়ে হিসেবে অস্বীকার করেন।
সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজে স্বাক্ষর করে জন্মনিবন্ধনের আবেদন দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ীই জন্মনিবন্ধন করা হয়েছিল। এরপরে ২০২৩ সালের সম্ভবত জানুয়ারির দিকে শিপ্রা চৌধুরী অফিসে এসে জানান ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েল তার সন্তান না। তাকে বলা হয়, একজন ব্যক্তির তো দুই জন পিতামাতা হতে পারে না। নামে ভুলভ্রান্তি থাকলে সংশোধন হতে পারে। কিন্তু পুরো পিতা-মাতা তো চেঞ্জ হতে পারে না। পরে তার চাপে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নির্দেশনা মোতাবেক সংশোধন হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শিপ্রা চৌধুরী সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। তবে, হোয়াটসঅ্যাপে তিনি পায়েলের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, ‘মেয়েটা ভালো না। ওকে অনেক যতœ করে বড় করলেও সে খারাপ আচরণ করত। আমি সরকারি চাকরি করতাম। আমার প্রতিটা ডকুমেন্টে একটি পুত্রসন্তানের নাম উল্লেখ করা ছিল। এই অবস্থায় আমি যদি দুই সন্তানের মা বলে দাবি করি তাহলে আমার পেনশন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল; এটাও আমাকে হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে সতর্ক করা হয়েছিল। এসব কারণে আমি তার বায়োলজিকাল মা-বাবার নামে ওর সব কাগজপত্র ঠিক করেছি।’
ডা. শিপ্রা জানান, ‘আমার ছেলে এবং বৌমা যখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে তখন মা হিসেবে আমার একটা পুত্রসন্তানের উল্লেখ ছিল। সে দেশের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্জ তো খুবই কড়া। আমাদের দেওয়া কোনো ভুল তথ্য যদি ওরা জানতে পারে তাহলে নাগরিকত্ব দেওয়া তো দূরের কথা, ওরা স্থায়ীভবে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে। আর এই জন্যই আমাকে তড়িঘড়ি করে পায়েলের নাম তার বায়োলজিক্যাল বাবা মা-র নামে করে দেওয়ার কার্যক্রম অনেক আগেই শুরু করতে হয়। তিনি দাবি করেন, পায়েলের প্রতি কোনো অন্যায় করেননি। পায়েল তার সঙ্গে অবাধ্য আচরণ করেছে।
ডা. শিপ্রা চৌধুরীর পুত্রবধু মোবাইল ফোনে জানান, আবেগের বশে এবং কাউকে না জানিয়ে তার শাশুড়ি পায়েলকে নিজের মেয়ে পরিচয়ে জন্মনিবন্ধন করিয়েছিলেন। পরে তিনি বুঝতে পেরে সংশোধন করে নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জন্মনিবন্ধনে তার শ্বশুরের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল অথচ তিনি বিষয়টি জানতেন না। পরে ভুল বুঝতে পেরে শাশুড়ি নথিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেন।
সংশোধিত নিবন্ধনে পায়েলের বাবা হিসেবে শিবগঞ্জ উপজেলার যে বাবুল মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন পায়েল তার মেয়ে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় ডা. শিপ্রা চৌধুরী আমার মেয়েকে নিয়ে যান। তখন তার নাম ছিল জেসমিন। ভবিষ্যতে যেন আমার কোনো দাবি না থাকে সে জন্য একটি কাগজে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল মেয়েটি তাদের পরিচয়েই বড় হবে। এখন এত বছর পর কেন তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে, সেটি আমি বুঝতে পারছি না।’ তিনি জানান, ১৫ বছর ডা. শিপ্রা তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। ২০২৩ সালে নতুন করে যোগাযোগ করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহীর সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জমসেদ আলী বলেন, যদি প্রমাণিত হয় পায়েল ডা. শিপ্রা চৌধুরীর ঔরসজাত সন্তান নন, তাহলে তিনি উত্তরাধিকার আইনে ওয়ারিশ হবেন না। তবে দীর্ঘদিন একটি পরিচয়ে বড় করার পর সেই পরিচয় অস্বীকার করে তার ক্ষতি করা হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ থাকতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মেয়েটি আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
একদিকে পরিচয় সংকট, অন্যদিকে আর্থিক অনিশ্চয়তা; একাধিক জন্মনিবন্ধন, ভিন্ন ভিন্ন বাবা-মায়ের নাম এবং একাডেমিক নথিতে অসঙ্গতি সব মিলিয়ে পায়েল যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তার সমাধান কী, তা জানেন না এই কিশোরী।
