মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই।

তবে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনার জন্য অর্থমন্ত্রীর পরিকল্পনাকে বাস্তবতার নিরিখে কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজস্ব নীতি ও সরকারের ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতার উপর নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি কোন দিকে থাকে। পাশাপাশি সরকার যেসব ভোগ্যপণ্যের কর ও শুল্ক ছাড় দিয়েছে, সেসব সুবিধা যাতে জনগণ পায়, সে বিষয়ে নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি, যা বর্তমানে সরকারের হাতে সীমিত। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা বেশ কঠিন হবে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার নিত্যপণ্য, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও বিভিন্ন সেবা খাতে কর ও শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাব কার্যকর হলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। যার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ মোট ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। এছাড়া জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ ও অন্যান্য মসলার ওপর ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব মসলার দাম কমতে পারে।

এছাড়া শিশুখাদ্য, খেজুর, সোনার গয়না, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও কিডনি সেবা, ওষুধ ও ক্যানসারের ওষুধ কাঁচামাল, বাদ্যযন্ত্র, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার ও মনিটর; সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও যন্ত্রাংশের উৎসে কর ও শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। এছাড়া শুল্ক ও কর কমানো এবং শুল্কায়ন মূল্যে পরিবর্তনের কারণে বিদেশি মাংস, প্রাণিখাদ্য, পয়েন্ট অব সেলস যন্ত্র, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিপস্টিক, ফেসওয়াশসহ বিভিন্ন প্রসাধনীসহ আরও বহু পণ্যের দাম কমতে পারে। জনজীবনে স্বস্তি আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহায়ক হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। এবারের বাজেটে অনুৎপাদনশীল খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ কৃষি, শিল্প ও উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম। সরকার যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়, অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমায়, রাজস্ব নীতি কঠোর করে এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমানো সম্ভব।

একই প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা সামছুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সরকারের সেই নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজার এখন মনোপলির (একচেটিয়া) শিকার এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের দখলে। তাই মূল্যস্ফীতির এই লক্ষ্য নির্ধারণ বাস্তবতার নিরিখে হয়েছে এমনটা বলা যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত