স্বপ্ন ছিল নতুন ঘর আর নতুন বউয়ের আগমনে সাজানো হবে সংসার। সেই স্বপ্নপূরণের ঠিক আগমুহূর্তেই প্রাণ হারালেন সাকিব হাওলাদার। সন্তানের অকালমৃত্যুর শোকে নির্বাক বাবা হযরত আলী হাওলাদার। মরদেহের পাশে বসে বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘কত কষ্ট করে ছেলে নতুন ঘর তুলেছে। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বিয়ে দেব, নতুন বউ ঘরে তুলব। সুখের সংসার করবে আমার ছেলে। কিন্তু কী হইয়া গেল...’
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে দাফনের আগমুহূর্তে ছেলের মরদেহের পাশে বসে এভাবেই আহাজারি করছিলেন তিনি। পরিবারের অদম্য ইচ্ছা ছিল নতুন ঘরে সাকিবের বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিভে গেল সাকিবের জীবন।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বেলা ১১টার দিকে বান্দরবান জেলা সদরের হাসপাতাল নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সাকিব হাওলাদারের মৃত্যু হয়। তিনি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চরকলমী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। একই দুর্ঘটনায় নিহত হন পার্শ্ববর্তী আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আলীর ছেলে কামরুল হাসান।
শুক্রবার দুপুরে দুই শ্রমিকের মরদেহ তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আর্তনাদ আর কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যানুযায়ী, বান্দরবান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলায় প্লাস্টারের কাজ করছিলেন সাকিব ও কামরুল। নির্মাণসামগ্রী ওপরে তোলার সময় অ্যালুমিনিয়ামের একটি পাত্র অসাবধানতাবশত বিদ্যুতের লাইনের সংস্পর্শে আসে। এতে তারা দুজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বান্দরবানের সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাদের সহকর্মী মঈন উদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গণপূর্ত বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী সুমিত রায় বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শ্রমিকদের অসতর্কতার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
অন্যদিকে, তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মান্না দে বলেন, কাজের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না এবং কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নিহত সাকিবের বাবা হযরত আলী হাওলাদার এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘ছেলে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাইত। নতুন ঘর তুলছিল, বিয়ের কথাও চলতেছিল। আল্লাহ আমার সব স্বপ্ন শেষ কইরা দিল।’
সাকিবের মতোই কামরুলের পরিবারেও এখন শোকের মাতম। একসঙ্গে কর্মস্থলে পাড়ি জমানো দুই তরুণ শ্রমিকের এ মৃত্যু চরফ্যাশনের এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। কোনোভাবেই যেন মেনে নিতে পারছেন না তাদের অকাল প্রস্থান।