সরানো হচ্ছে না রোগী নতুন ভর্তি বন্ধ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৩৬ এএম

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর নতুন করে রোগী ভর্তি বন্ধ রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখন শুধু ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীদের কেউ কেউ হাসপাতালটি ছেড়ে আশপাশের হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। লাইসেন্স বাতিলের চিঠির পর ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকায় আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এরই মধ্যে তাদের আইনজীবী শিশির মনির দাবি করেছেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে হাসপাতালের বদলে প্যাথলজির লাইসেন্স নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।

এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এটা কোনো ইস্যু নয়, টাইপিং মিসটেক হতে পারে। তবে লাইসেন্স নম্বর ভুল হলেও সব জায়গায় স্পষ্ট করে হাসপাতাল উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিভান্ত ছড়ানোর কিছু নেই। ঘটনার পর থেকে আদ্-দ্বীনের কার্যক্রম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভালোভাবে নিচ্ছে না।

শিশির মনিরের পোস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সৈয়দ আবু আহমেদ শফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা বড় কোনো বিষয় না। টাইপিং মিসটেক হতে পারে। হাসপাতালেরই লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ঘটনাটি হাসপাতালেই ঘটেছে। তদন্ত কমিটি নানা অসংগতি পেয়েছে। তারা আপিলের জন্য এক মাস সময় পাচ্ছে। আর যদি প্যাথলজির বিষয়ে ভুল ধরে তারা এগোয় তাহলে বলব, শোকজের জবাবে তারা তখন এটা বলেনি কেন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, আদ্-দ্বীন যা করছে, তা মোটেও ভালো করছে না। ঘটনার পর থেকে তারা প্রতিটা পদক্ষেপই ভুল নিচ্ছে। লাইসেন্স বাতিলের পর তারা যে রোগীদের দিয়ে বিক্ষোভ করাল, এগুলো করে কি তারা মব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। জামায়াতি প্রতিষ্ঠান বলে তারা যা খুশি তাই করবে। তাদের প্রতিষ্ঠানে ছয়টি শিশু মারা গেছে। তারা থাকবে নমনীয়, অথচ দেখেন, সাংবাদিকও কিন্তু এর মধ্যে পেটাল। তারা কি সব গায়ের জোরে করতে চায়। জামায়াতের আমিরের পোস্ট নিশ্চয়ই দেখেছেন। তিনি বলছেন, দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু লাইসেন্স বাতিল করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কাম্য নয়। তাহলে আমার প্রশ্ন ‘চিকিৎসা অনুশীলন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও পরীক্ষাগার (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিল করা কি আইনবহির্ভূত? নাকি তিনি বলতে চাইছেন এই ধারাই বহির্ভূত? তারা কি আইনের প্রতিশ্রদ্ধাশীল নয়?’

গতকাল শুক্রবার আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রোগী ভর্তি বন্ধ রেখেছি। নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না। কিন্তু আগে থেকে যারা ভর্তি আছেন, তাদের যথারীতি চিকিৎসা চলছে। রোগী অন্যত্র সরানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। কেননা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লিখিতভাবে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আমাদের দেয়নি। লাইসেন্স বাতিল করেছে। কিন্তু ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ আছে। আমরা আইনজীবীদের মাধ্যমে আপিল করব।’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ‘চিকিৎসা অনুশীলন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও পরীক্ষাগার (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী এ লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে বলে লাইসেন্স বাতিলের চিঠিতে জানানো হয়।

গতকাল দুপুরে হাসপাতালটিতে আয়োজিত প্রেস বিফিংয়ে মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পুনর্বিবেচনার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করা হবে। আশা করব, জনগণের কথা বিবেচনা করে সরকার জনস্বার্থে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রাখার অনুমতি দেবে। যে ওয়ার্ডে ছয়টি শিশু মৃত্যুবরণ করেছে; সেই ওয়ার্ড বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে সেই ওয়ার্ডের সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করব।’

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানান, হাসপাতালে ৪১৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া এনআইসিইউতে ৬০ নবজাতক, আইসিইউতে ২০ এবং সিসিইউতে চারজন রোগী ভর্তি রয়েছে।

গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর এর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে হাসপাতালটির দায় প্রমাণিত হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি অসংগতি পায় তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে, ভবনটি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হাসপাতালটি জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত। ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে হাসপাতালটির পক্ষ নিয়ে জামায়াতের অনেকেই সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। মাঠে সক্রিয় দেখা যায়, জামায়াতসংশ্লিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরকে। তিনি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। মৃত নবজাতকদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকাসহ নানা সুবিধা দেওয়ার কথাও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। গত বৃহস্পতিবার লাইসেন্স বাতিলের পর প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন অনেকেই। সেই তালিকা থেকে বাদ যাননি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও।

পোস্টে তিনি লিখেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল মোটেই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে কোনো অবহেলা, ত্রুটি কিংবা অপরাধ চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারও কোনো দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু লাইসেন্স বাতিল করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কাম্য নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত