সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার নিয়ে মৌলিক আপত্তি না থাকলেও এর বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজস্ব আহরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা। কারণ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও বাস্তবসম্মত ভিত্তির বড় অভাব রয়েছে।’
গতকাল শুক্রবার গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
বাজেটের মূল বিশ্লেষণ তুলে ধরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ধীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবুও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। তবে চলতি অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে তা ৪ শতাংশের কিছু বেশি। একইভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাজেটে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হলেও চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এর প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগে বিদ্যমান অনীহা ও আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের ফলে সরকারি ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অবদান না রাখে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হলে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ‘বাজেটে নির্ধারিত অনেক লক্ষ্যমাত্রায় উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতিফলন রয়েছে। উচ্চাকাক্সক্ষা থাকা ইতিবাচক হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। তবে মূল চ্যালেঞ্জ বাজেটের আকার নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা অপরিহার্য, যেখানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সরকার আমদানি-প্রতিস্থাপক শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর-সুবিধা দিয়েছে। যেখানে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে সেখানে শুল্ক, অগ্রিম আয়কর ও অন্যান্য কর আরোপ করা হয়েছে। আবার যেখানে রপ্তানি বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে সেখানে বিভিন্ন কর ও শুল্ক কমিয়ে প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নানা ধরনের প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কি না। আমার মতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। কারণ বাজেটের প্রায় সব প্রাক্কলন এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, রপ্তানি, আমদানি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সব ক্ষেত্রেই যে ভিত্তি ধরা হয়েছে, আমাদের বিশ্লেষণ বলছে সেটি দুর্বল।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের বেশি থাকলেও অনেক কমে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আবার রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অর্জনের জন্য শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে আকস্মিক ও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে হবে বলে জানান তিনি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বৈষম্য বাড়াবে : প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে অর্থনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক; কোনো দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের সুযোগ বারবার দেওয়া হলেও সরকারের রাজস্ব আয় খুব একটা বাড়ে না। বরং এটি সৎ করদাতাদের জন্য একটি ‘মরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, “বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও ভিন্নভাবে এই সুযোগ রাখা হয়েছে। মূলত জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই সুযোগ বেশি দৃশ্যমান হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মৌজা রেট বা নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দামের বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এই নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই অনেক টাকা অপ্রদর্শিত বা ‘কালো’ হয়ে যায়। সরকার এখন মৌজা রেট হালনাগাদ করার পরিকল্পনা করছে এবং একে এ ধরনের সুযোগ দেওয়ার একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে যে, নীতিমালার পরিবর্তনের আগে এটিই হবে ‘শেষ সুযোগ’।”
বাজেটের বিশ্লেষণে সিপিডি জানান, কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি নৈতিকভাবেও এটি কাম্য হতে পারে না। কারণ যারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর দিচ্ছেন, তারা এতে নিরুৎসাহিত হন। তাদের মনে এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এখন কর না দিয়ে পরবর্তীতে বাড়তি সুবিধা নিয়ে টাকা সাদা করার সুযোগ নিলে সেটিই হয়তো বেশি লাভজনক। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, দুর্নীতিবাজ ও কর ফাঁকিবাজদের সরকার বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে।
করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল : কর-কাঠামোতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে। সেই বিবেচনায় প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে মনে করে সিপিডি। সিপিডির মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এ প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি প্রক্ষেপণ বা পথরেখা দেওয়া হয়েছে। যেমন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা একরকম থাকলেও ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা হবে ৪ লাখ টাকা। এর পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। করের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। এতে করদাতারা আগে থেকেই জানতে পারেন যে কত আয় করলে কত টাকা কর দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই সামান্য বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। করমুক্ত আয়ের সীমাটা আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে।’
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার : বাজেটে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। মোস্তাফিজুর বলেন, এক বছরের মধ্যে এই বিশাল রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যদি রাজস্ব আদায় কম হয় এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং তা পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কেবল শুল্ক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা নীতিগত সুবিধার চেয়েও গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। তার মতে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংস্কারের বিষয়ে বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটের মূল লক্ষ্য অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা। বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেটের আকার নিয়ে বিতর্কের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের বাস্তবায়ন দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। টাকার এই অঙ্ক চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।