দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি, প্রটোকল ও নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য বাংলাদেশ ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) গতকাল শুক্রবার এক প্রেস বিবৃতিতে এ কথা জানায়।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম এ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। আর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
বিজিবির বিবৃতিতে বলা হয়, মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। উভয়পক্ষ সীমান্ত হত্যা ও হামলা শূন্যে নামিয়ে আনতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণে সম্মত হয়। নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনাগুলো তদন্ত করা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়।
বিজিবি থেকে বলা হয়েছে, বিএসএফ কর্তৃক রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমার নাগরিক ও ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া (পুশইন) সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি ও প্রটোকলের পরিপন্থী। বিজিবি ডিজি বলেন, যেকোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হন, তবে তাকে প্রচলিত আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গ্রহণ করা হবে। তিনি বিএসএফ মহাপরিচালককে এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা এবং বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানান। বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সব অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ বিষয় দ্রুত সম্পন্ন করার এবং তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। উভয় পক্ষ পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের চেতনায় এসব প্রক্রিয়ার কার্যকর বাস্তবায়নে তাদের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁঁজা এবং আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও বিজিবি তুলে ধরে। উভয় পক্ষ চোরাচালান প্রতিরোধে একমত হয়।
বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে ১৫০ গজের মধ্যে ভারত কর্তৃক বেড়া ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য আহ্বান জানান। তিনি ভবিষ্যতে সব নির্মাণ কার্যক্রম কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনাক্রমে করার তাগিদ দেন। তিনি সীমান্ত রেখার নিকটবর্তী এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি, স্ট্রিট লাইট, সিসি ক্যামেরা এবং অন্যান্য অবকাঠামো স্থাপন সম্পর্কেও উদ্বেগ জানান। তিনি অননুমোদিতভাবে ডিউটি পোস্ট, ধাতব সড়ক ও কংক্রিট কাঠামো নির্মাণের চলমান ঘটনা তুলে ধরেন এবং ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষ সংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান। উভয়পক্ষ সম্মত হয় যে, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো অননুমোদিত নির্মাণ কার্যক্রম থেকে তাদের নিজ নিজ মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে বিরত রাখতে নির্দেশ প্রদান করা হবে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিদ্যমান নিয়ম ও প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন। উভয়পক্ষ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ, নিজ নিজ ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে না দেওয়া, সতর্কতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়।
উভয়পক্ষ সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও গরুসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান, জাল মুদ্রা প্রচলন, মানব পাচার ও অবৈধ আন্তঃসীমান্ত চলাচল প্রতিরোধে কঠোর সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়।
বিজিবির মহাপরিচালক অনিশ্চয়তা এড়ানো, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য মুহুরী চর ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান অস্থায়ী চিহ্নগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী সীমান্ত পিলার দ্বারা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বিশেষ করে নদীভিত্তিক এলাকায় আন্তর্জাতিক সীমান্তের অবশিষ্ট অনির্ধারিত অংশগুলোর দ্রুত নির্ধারণের আহ্বান জানান।
বিজিবি দুই দেশের ২০২২ সালের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কুশিয়ারা নদীর অভিন্ন অংশ থেকে বাংলাদেশে চাষাবাদের জন্য ন্যায্য পানি (১৫৩ কিউসেক) প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে রহিমপুর খালের অবশিষ্ট খনন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৭টি জরুরি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পে সম্মতি প্রদানের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালকদের বৈঠকের পর প্রথাগত যৌথ সংবাদ সম্মেলন এবার হয়নি। বিএসএফ গতকাল শুক্রবার ‘যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তি’ দাবি করে বৈঠকের বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। অন্যদিকে বিজিবির বিবৃতি একক বিবৃতি।
বিএসএফ বিজ্ঞপ্তি জারির পর বিবিসি শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক পুশইনের কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। বিএসএফের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘উভয় প্রতিনিধি দল সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা, অবৈধ, অনিচ্ছাকৃত ও জোরপূর্বক সীমান্ত পারাপার, সীমান্ত পরিকাঠামো নির্মাণ, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।’
বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের পরবর্তী সম্মেলন আগামী নভেম্বর (২০২৬) মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালকদের বৈঠকে আলোচনায় এলেও সীমান্তে ভারতের দিক থেকে পুশইন বন্ধ হয়নি।
দেশ রূপান্তরের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার ভোররাতেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার হোগলবাড়িয়া থানার চরমেঘনা সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ ১২ জনকে বাংলাদেশের দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের চরবিলগাথুয়া সীমান্তে পুশইন করার চেষ্টা করে। বিএসএফ ১২ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়ে তাদের গেট বন্ধ করে দেয়। তাদের মধ্যে চারজন নারী, চারজন শিশু ও চারজন পুরুষ রয়েছে।
বিজিবি ও স্থানীয় নাগরিকরা টের পেয়ে তাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দেয়। বর্তমানে তারা সীমান্তে শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান নারী, শিশু ও পুরুষসহ ১২ জনকে সীমান্তে ঢুকতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।