ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে কঙ্গোর ইবোলা প্রাদুর্ভাব

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:১৫ এএম

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআরসি) নতুন নতুন এলাকায় প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। জনাকীর্ণ বাস্তুচ্যুতদের শিবিরেও ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক এবং আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শুক্রবার (১২ জুন) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভাইরাসের বিরল 'বুন্দিবুগিও' স্ট্রেনে সৃষ্ট এই প্রাদুর্ভাব এখন নতুন আক্রান্ত এলাকাগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এর বিপরীতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আশানুরূপ কার্যকর হচ্ছে না।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইবুরির (যেখানে প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল) পাশাপাশি উত্তর কিভু এবং দক্ষিণ কিভু প্রদেশে মোট ৬৭৬ জনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া আরও ১১৯ জন আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপিডেমিওলজি ও অ্যানালিটিক্স প্রধান অলিভিয়ে লে পোলাইন জানিয়েছেন, আক্রান্ত তিনটি প্রদেশের নতুন নতুন স্বাস্থ্য অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‌‘এটি প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতাকেই তুলে ধরছে। প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা শনাক্তের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি এবং জনগণের ব্যাপক চলাচলের কারণে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।’

ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীদের আইসোলেশনে রাখার জন্য যে পরিমাণ শয্যা প্রয়োজন, বাস্তবে তার সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল।

লে পোলাইন আরও বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নতুন আক্রান্ত এলাকাগুলোতে আসা রোগীদের ইতিহাস যাচাই করে সংক্রমণের উৎস খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আক্রান্ত নতুন এলাকাগুলোতে স্থানীয় পর্যায়েই ভাইরাস ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখনও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র অজানা (ব্লাইন্ড স্পট)। নজরদারি বাড়লে পরিস্থিতির স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।’

তিনি স্বীকার করেন যে, কন্টাক্ট ট্রেসিং বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজ উন্নত হলেও তা এখনও নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, রোগীদের নিরাপদে আইসোলেশনে রাখার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা এখন জরুরি।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, ইতুরি প্রদেশের জনাকীর্ণ ‘পাঙ্গা’ বাস্তুচ্যুত শিবিরে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় এক সাহায্যকর্মীর তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মে এবং ১ জুন এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে।

পাঙ্গার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে শত শত মানুষ একটি মাত্র শৌচাগার ব্যবহার করায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের ডিআরসি কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্যাটলিন ব্র্যাডি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা সবাই উদ্বিগ্ন যে, এই শিবিরগুলোতে ইবোলা অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে এবং আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা মানুষ শিবির ছেড়ে পালিয়ে যাবে।’

কঙ্গোর এই পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে প্রতিবেশী উগান্ডা। উগান্ডায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন আক্রান্ত হওয়ার ও দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে আফ্রিকান ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, উগান্ডায় পরিস্থিতি বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

কঙ্গোর এই সংকটের পেছনে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সংঘাত বড় ভূমিকা রাখছে। খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কারণে সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে, যা ইবোলা মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত