রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় ‘সুনিপুণ অর্গানিকস’ নামে একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্থানীয় চার দরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ি উচ্ছেদ চেষ্টার তীব্র অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে ওই পরিবারগুলোকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিপুল অংকের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পৈতৃক বা দীর্ঘদিনের আশ্রয়স্থল দখলের পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে সরকারি খাস জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেওয়া এই পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের এমন আকস্মিক তৎপরতায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিন দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাউল্লা ফকিরপাড়ায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে আসে। স্থানীয়রা জানায়, হেলিপ্যাড সংলগ্ন ওই এলাকায় সরকারি বেশ কিছু খাস এবং রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমি রয়েছে। পদ্মার ভয়াবহ নদী ভাঙনে সবকিছু হারানো ও নিঃস্ব কিছু অসহায় পরিবার বহু বছর ধরে এখানে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করে আসছেন।
নদী ভাঙনের শিকার বেলায়েত হোসেন বলেন, আমি নদী ভাঙনে সব হারিয়ে আজ নিঃস্ব মানুষ। প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে সপরিবারে বসবাস করছি। কিন্তু এখন হঠাৎ সুনিপুন মিলের লোকজন এসে দাবি করছে তারা নাকি এই জমি লিজ নিয়েছে। আমার পরিবারকে এখান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের জন্য মামলা-মোকদ্দমাসহ নানা ধরনের আইনি ও সামাজিক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মিলের লোকজন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জোর করে আমার বাড়ির একাংশ ভেঙে ফেলে দুটি পাকা পিলার স্থাপন করেছে। এখন তারা দ্রুত ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু আমি এই বৃদ্ধ বয়সে পরিবার নিয়ে কোথায় যাব? আমাদের মাথা গোঁজার আর কোনো বিকল্প জায়গা নেই। শুধু তাই নয়, বেলায়েত হোসেন আরও বলেন, ঘর ভেঙে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য অগ্রিম বাবদ স্থানীয় বিএনপি নেতা হালিম ফকির ও জাহিদ ফকির তার বাড়িতে এসে জোরপূর্বক বিছানার ওপর আড়াই লাখ টাকা রেখে গেছেন। তবে তারা এই অন্যায্য টাকা নিয়ে নিজেদের চিরচেনা আশ্রয়স্থল ছাড়তে কোনোভাবেই রাজি নন।
একই এলাকার অপর বাসিন্দা ও পেশায় রিকশাচালক মো. আসাদ খান বলেন, কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই হালিম ফকির এসে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই আমার বসতভিটার মাপঝোক শুরু করেন। আমাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, এই জায়গা নাকি মিলের সীমানার মধ্যে পড়ে গেছে, তাই আমাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। আমি সারাদিন রিকশা চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে আমাদের তিনটি পরিবার এই ছোট্ট জায়গার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছে। কোনো বিকল্প আবাসন বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া আমরা কোথাও যেতে পারব না। তাই বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ শুরু করতে এলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের বাঁধা দেই।
আরেক বাসিন্দা ও বিধবা নারী রেশমা খাতুন বলেন, আমি আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় এখানে থাকি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিভিন্নভাবে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিছু অপরিচিত লোক এসে আমাদের টাকা দেওয়ার প্রলোভনও দেখিয়েছে। কিন্তু আমরা এই টাকার বিনিময়ে আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল ছেড়ে কোনো অজ্ঞাত স্থানে চলে যেতে রাজি নই।
এদিকে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অভিযুক্ত স্থানীয় নেতা জাহিদ ফকির বলেন, আমি কাউকে উচ্ছেদের জন্য কোনো ধরনের চাপ দেইনি বা ভয় দেখাইনি। বরং আমি উভয় পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতার চেষ্টা করেছি মাত্র। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে যে আমি কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়েছি বা হুমকি দিয়েছি, তবে আমি যেকোনো আইনি শাস্তি মাথা পেতে মেনে নেব।
অন্যতম অভিযুক্ত হালিম ফকির বলেন, বেলায়েত সম্পর্কে আমার আত্মীয় হয়। সে নিজেই আমাকে এই সংকটের মধ্যস্থতা করার জন্য ডেকেছিল। আমি শুধু একজন নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশী হিসেবে বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি।
অন্যদিকে, জমি দখলের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে সুনিপুন মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, বেলায়েত আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এবং তার সাথে আমাদের কোনো পূর্ব শত্রুতা বা বিরোধ নেই। মিলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার স্বার্থে একটি স্থায়ী বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সে বিষয়েই তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছিল। আমরা কাউকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে চাই না। আমরা আশা করছি, পারস্পরিক সম্মান ও সমঝোতার ভিত্তিতেই খুব দ্রুত বিষয়টির একটি সুষ্ঠু সমাধান হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহল অসহায় পরিবারগুলোর অধিকার রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।