গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঘটে গেল এক গা শিউরে ওঠা দুর্ঘটনা। ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের চোখের সামনেই একটি দূরপাল্লার বাস আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেছে। তবে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মতান্ত্রিক সতর্কতার কারণে বাসের বিপুল সংখ্যক যাত্রী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, আজ শুক্রবার ( ৫ জুন) সকাল আনুমানিক ৯টা ৪৫ মিনিটেরর দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের ৭ নম্বর পন্টুনে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘এস বি পরিবহন’ নামক একটি দূরপাল্লার বাস ৯টা ৩০ নিনিটের দিকে ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য অবস্থান করছিল। সে সময় ফেরিঘাটের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গণপরিবহন থেকে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
দুর্ঘটনার শিকার বাসটি থেকে যাত্রীদের নামানোর পরপরই সেটি ঘাটে ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই চালক বাসটির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাসটি ফেরি অ্যাপ্রোচ সড়ক হয়ে পন্টুনের দিকে ধাবিত হয় এবং সেখানে থাকা একটি ইউটিলিটি ফেরি করবীর লোহার ডালা ও সুরক্ষামূলক শেকল ভেঙে সরাসরি গভীর পদ্মায় ছিটকে পড়ে যায়। ঘটনার সময় বাসটিতে চালক অবস্থান করছিলেন।
ভয়াবহ এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওই বাসেরই একজন যাত্রী আব্দুস সালাম নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি ও আমার পরিবার সকাল ৭টার সময় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে এস বি পরিবহনের এই বাসে চড়েছিলাম। যদিও বাসটি তার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছিল। দৌলতদিয়া ঘাটের পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সব যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমরা নামার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখের সামনে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে তলিয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা বেঁচে গেছি, কারণ ওই সময় বাসে চালক ছাড়া কোনো যাত্রী ছিলেন না। তবে চালক অক্ষত অবস্থায় বের হতে পেরেছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত তৎপরতা শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ 'হামজা' দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি উদ্ধারে পুরোদমে অভিযান শুরু করে। উদ্ধারকারী দলের টানা ও নিবিড় প্রচেষ্টায় সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে হামজার সাহায্যে বাসটিকে প্রথম নদী থেকে টেনে ওপরে তোলা হয়। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ পরিচালনা করে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে সম্পূর্ণ বাসটি নদী থেকে টেনে পাড়ে তুলতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার পর মাত্র ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের রেকর্ড সময়ের মধ্যে পুরো বাসটি নদী থেকে সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, পুরো উদ্ধার অভিযানে এবং মূল দুর্ঘটনায় কোনো ধরনের প্রাণহানি বা বড় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের ওই বাসটি দৌলতদিয়া 7নং ফেরিঘাট পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পন্টুনে বাসটি ওঠার পরপরই যাত্রীদের নামানো হচ্ছিল, যার ফলে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বিপিএম বলেন, পূর্বের দুর্ঘটনার পর জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসি সমন্বিতভাবে ঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিশেষ করে যাত্রীদের বাস থেকে নামানোর বিষয়ে আমাদের কঠোর নির্দেশনা ছিল, যার ফলে এবার বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, বাসটি ফেরির পাটাতনের শেকল ভেঙে নদীতে পড়ে গেলেও ভেতরে কোনো যাত্রী ছিল না। শুধু চালক ও সহকারী (হেলপার) সামান্য আহত হয়েছেন। নৌ-রুটে যাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটে আরও কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানো হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
উল্লেখ্য, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। এর আগে গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পল্টুনে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের আরেকটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় একইভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিল। সেই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় ২৬ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পূর্বের সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির স্মৃতি মাথায় রেখে আজকের এই পুনরাবৃত্তির ঘটনায় ঘাট এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ফিটনেস সংক্রান্ত তদারকি নিয়ে আবারও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
