যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ঘোষণা’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। গতকাল বুধবার আজারবাইজানে এক সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। গালিবাফ বলেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং আলোচনা শুরুর এই প্রাথমিক সমঝোতা কোনো ‘চাপ বা জবরদস্তির ফল নয়, বরং এটি সাহসী ইরানি জাতির প্রতিরোধ ও কর্র্তৃত্বের বহিঃপ্রকাশ’। আর সে কারণেই সমঝোতা স্মারকটি ট্রাম্প প্রশাসনের পরাজয়ের ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোরই উচিত এই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করা।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর লক্ষ্যে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব প্রথমবারের মতো অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে এ বিল পাস হয়। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে বিলটি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ২১৫-২০৮ ভোটে পাস হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ থামাতে সিনেটে এটি ছিল দশম প্রচেষ্টা। প্রস্তাবটি আগের উদ্যোগগুলোর তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। যদিও প্রস্তাবটির পূর্ণ আইনি বাধ্যবাধকতা নেই এবং এটি মূলত প্রতীকী, তবু যুদ্ধ এবং তা শেষ করতে ট্রাম্পের করা ইরান চুক্তি নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের একাংশ রিপাবলিকান সদস্যের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
সিনেট ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার বলেন, বারবার সিনেটের অধিকাংশ রিপাবলিকান সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বদলে ট্রাম্প এবং তার যুদ্ধের পক্ষ নিয়েছেন। শুমার আরও বলেন, ইরানে ট্রাম্পের ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের। দেশটির ইতিহাসে এটি অন্যতম নিকৃষ্ট পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত পদক্ষেপ হিসেবে লেখা থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। অতীতে সর্বোচ্চ চারজন রিপাবলিকান সিনেটর যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। মঙ্গলবারও তারা একই অবস্থানে ছিলেন। তারা হলেন, আলাস্কার লিসা মারকাউস্কি, মেইনের সুসান কলিন্স, কেন্টাকির র্যান্ড পল এবং লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি। তবে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন।
তবে সিনেটে পাস হওয়া প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, সিনেটের এই পদক্ষেপ তার কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষেরই সুবিধা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি যখন ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলেছি, তারা যখন পুরোপুরি নতিস্বীকার করতে প্রস্তুত এবং আমাদের কার্যত সবকিছুই দিতে রাজি, এমনকি কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্টকে চরম সমীহ করছে; ঠিক তখনই সিনেট একটি অসময়োচিত ও অর্থহীন যুদ্ধক্ষমতা আইন ভোটের সিদ্ধান্ত নিল’।
এদিকে, কোনো ধরনের শুল্ক বা টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ওমান। একই সঙ্গে এই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রণালির বিদ্যমান নৌপথের উত্তর ও দক্ষিণে দুটি অস্থায়ী বিকল্প রুট নির্ধারণ করেছে দেশটি। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সঙ্গে সমন্বয় করে ওমান এই অস্থায়ী জলসীমা করিডর তৈরি করেছে। পাশাপাশি হরমুজে আটকেপড়া ১১ হাজার নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে আইএমও। সংস্থাটির মহাসচিব জানিয়েছেন, ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলো এবং সামুদ্রিক শিল্পের সহযোগিতায় এই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হবে। ওমানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নাবিকদের সরিয়ে নিতে আইএমওর কার্যক্রমটি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলেছে। এখন এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
গত সপ্তাহে উভয় পক্ষ ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে, যেখানে যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হওয়া গেছে। এই অন্তর্বর্তী চুক্তিটি পরবর্তী সময়ের ৬০ দিনের বিস্তারিত আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজে বের করা। তবে এই আলোচনা ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের অসংগতি ও মতভেদ রয়ে গেছে। গতকাল বুধবার জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আইএইএ জানিয়েছে, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আবার পরিদর্শন শুরু করবে। যদিও ইরান দাবি করেছে, তারা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।