চালতা ফুলের হাসি

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:১৪ এএম

শিশিরের জলে না হোক, এ সময় বৃষ্টির জলে ভিজছে অপরূপ চালতার ফুল। বৈশাখের শেষ দিন, রমনা উদ্যানের ভেতরে হাঁটছি। সকালবেলার আকাশটা গোমরা হয়ে মুখ ঢেকে আছে ধূসর মেঘের নেকাবে। সূর্য আছে রোদ নেই, মেঘ আছে বৃষ্টি নেই। এমন এক সকালে সেই অনুজ্জ্বল সময়গুলোও যেন চালতার আমন্ত্রণের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। রমনা উদ্যানের ভেতরে তিনটা চালতা গাছের একটিতে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে, একটা গাছে পাতা গজাচ্ছে, অন্য গাছটা প্রায় নিষ্পত্র। একই গাছের একই সময়ে এরূপ বৈপরীত্য ভাবায় বৈকি!

পাবনার টেবুনিয়ায় এক বর্ষাকালে দেখেছিলাম চালতা ফুলের পূর্ণরূপ। ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে, গাছের ডালে ফুটে আছে অসংখ্য চালতা ফুল। ঘনমেঘে আঁধার ঘনিয়ে আসা সকালে সাদা সাদা ফুলের সে হাসি কখনো ভুলতে পারিনি। বর্ষাকালেই সাধারণত চালতা ফুল ফোটার কথা। কিন্তু এবার কেন জানি না বৈশাখের শেষেই তার দেখা পেলাম। হয়তো বৈশাখটাই বৃষ্টিময় হয়ে গেছে বলে। বুনো ফুল হলেও চালতা ফুলের রূপের কোনো তুলনা হয় না। এ ফুলের আকার যেমন বড়, তেমনি সে রূপবতী, দুধসাদা মেম সাহেবদের মতো। ডালের আগায় ফুল ফোটে ও ফুলগুলো মাটির দিকে ঝুলে থাকে। ফুলে পাঁচটি বড় বড় পাপড়ি, তাকে ঘিরে থাকে পাঁচটি স্থায়ী বৃতি। পাপড়ি খসে গেলেও বৃতিগুলো রয়ে যায়। ফুলের মাঝখানে প্রচুর হলদে রঙের পুরুষ কেশর থাকে, তার উপর থাকে তারার মতো কুড়িটি গর্ভকেশর বা গর্ভপত্র। প্রতিটি গর্ভপত্রে পাঁচটি করে বীজ হয়। ফুলের মৃদু সুগন্ধ আছে। ফুল ফোটে রাতে, সকালেই পাপড়ি খসে পড়ে, খুবই ক্ষণস্থায়ী।

খুব সকালে না গেলে চালতা ফুলের সে পূর্ণরূপ সহজে দেখা যায় না। আলতো করে ধবল পাপড়িগুলো খসে পড়ে ফুল থেকে। ডালে ডালে সবুজ বোঁটায় ঝুলে থাকে বাটির মতো বৃতির কোষে জনন কেশরগুচ্ছ। আর সে ফুলগুলোকে ছায়া দেয় নবপত্রপল্লবেরা। শীতে নিষ্পত্র চালতা গাছের ডালে ডালে বৈশাখে এসেছে নব যৌবন, নতুন উন্মাদনা। কচিকদলীপত্রসম শ্যামলিমা যেন তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। পাতা পাতায় ভরে আছে সমস্ত শাখা-প্রশাখা। কোনো কোনো ডালে পাতার বোঁটার কোল থেকে বেরিয়ে এসেছে লম্বা বোঁটা, তার মাথায় দেওয়াল ঘড়ির পেণ্ডলোমের মতো দুলছে বলের মতো কুঁড়িগুলো। শক্ত সবুজ আবরণ পুষ্পকে দিয়েছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা। ফুল ফোটার পর ফলবতী হলে ওসব শক্ত বৃতিগুলোই সুঠাম ফলে রূপান্তরিত হয়। চালতা গ্রামীণ জঙ্গলের ভোজ্য ফল। ওই শক্ত বৃতিগুলো পরিপক্ব হলে সেগুলোই আমরা খাই। অন্য ফলের মতো চালতার ভেতরে শাঁস হয় না। গুপ্ত থাকে জননকোষ আর বীজের আঁধারগুলো।

চালতাগাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম উরষষবহরধ রহফরপধ ও গোত্র ডিলেনিয়েসী। চালতাগাছ মাঝারি আকারের বৃক্ষ, ডালপালা এলোমেলোভাবে বাড়ে ও ছড়ায়। গাছের বাকল লালচে। তবে পূর্ণ পল্লবিত অবস্থায় গাছ বেশ ছায়াঘন। পাতা বড়, লম্বাটে, অগ্রভাগ সরু, কিনারা করাতের মতো খাঁজকাটা, শিরাবিন্যাস স্পষ্ট। ফল প্রায় গোলাকার, সবুজ, পরিপক্ব হলে হলদে পীতাভ রং ধারণ করে ও ফল থেকে বিশেষ ধরনের সুমিষ্ট ঘ্রাণ বের হয় যা দিয়ে বোঝা যায় ফল পেকেছে কি না। কাঠ শক্ত, জ¦ালানি ও নৌকা তৈরি করা হয়, বন্দুকের বাঁটও এ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। ঔষধি গুণও আছে।

কবি সুজন সুপান্থ ‘লিখে রাখি চালতা ফুলের গভীর’ নামে একটা কবিতাগুচ্ছ লিখেছিলেন গত বছর। লেখার শেষে এসে সে কবিতার কয়েকটা পঙ্ক্তি মনে পড়ছে ‘লিখে রাখি কদমের ঘোর/লিখে রাখি চালতা ফুলের গভীর/লিখে রাখি জবা ফুলের লাল ও ছাতিমের ঘ্রাণ/সে প্রেমের হোক তুমুল সম্বোধন।’ বুনোফুল চালতারও হোক সেরূপ সম্বোধন। প্রাকৃতিক ভূজন্মা চালতাগাছ ঠাঁই পাক গৃহস্থের আঙিনায়, উদ্যানে ও পথের কিনারে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরাও বর্ষাভেজা দিনে দেখি চালতা ফুলে পাপড়ির অবগুণ্ঠনে ঢাকা গভীর সৌন্দর্যকে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত