চেয়ারম্যানের দায়িত্বে মাদক মামলার পলাতক আসামি

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:১৭ এএম

মাদক মামলার পলাতক আসামি আবদুল মান্নান ওরফে মান্নান মেম্বারকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। আব্দুল মান্নান ৭নং ওয়ার্ডের এই ইউপি সদস্য শাহপরীর দ্বীপের সীমান্তে মাদক চোরাচালানের মূল হোতা এবং দেড় লাখ ইয়াবা জব্দ মামলার পলাতক আসামি। এ নিয়ে উপজেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে ইউএনও জানান, এমপি মহোদয়ের ডিও লেটার ছিল। মাদক মামলার আসামি কীভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবকিছু প্রসিডিওর অনুযায়ী হয়েছে।

জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামীপন্থি চেয়ারম্যান নুর হোসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান নুর হোসেনকে গত ২৪ মে চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহালের আদেশ দেন হাইকোর্ট। তবে এই আদেশকে অমান্য করে উপজেলা ও স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ইয়াবা সম্রাট খ্যাত ও মাদক মামলার পলাতক আসামি আবদুল মান্নান মেম্বারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত গতকাল তাকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়।

সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান ‘ইয়াবা সম্রাট’ নামে পরিচিত। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাতে শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়া এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে দেড় লাখ পিস ইয়াবাসহ মোস্তাক ও তার বাবা ট্রলারের মাঝি আবুল হোছন আটক হন। তাদের স্বীকারোক্তিতে এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবার মূল মালিক ও অর্থদাতা হিসেবে উঠে আসে মান্নান মেম্বারের নাম। পরে র‌্যাবের দায়ের করা মামলায় (মামলা নং ৭৪৮/২৪ ইং) তাকে প্রধান আসামি করা হয়।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, টেকনাফ যেখানে মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত, সেখানে একজন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো মানে মাদক চোরাচালানকে আরও উৎসাহিত করা।  সামাজিক মাধ্যমে টেকনাফ পৌরসভার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. ইসমাইল লিখেন, ‘সাবরাং রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আব্দুল মান্নান, কী বলছে জনমত।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামীপন্থি চেয়ারম্যান নুর হোসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে প্যানেল-১ ইউপি সদস্য শামসুল আলম মেম্বার স্বেচ্ছায় অব্যাহতি দেন। প্যানেল-২ মো. শরীফ মেম্বারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এরপর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছিদ্দিক আহমদকে সভাপতি করে অন্য ১১ জন ইউপি সদস্যের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে প্যানেল গঠন করা হয়। প্যানেল-৩ এ দায়িত্বরত ইউপি সদস্য ফারিহা ইয়াসমিন প্রথমে অব্যাহতি দিলেও পরে হাইকোর্টে রিট করে স্বপদে পুনর্বহাল হন। 

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কবির আহমদ জানান, আবদুল মান্নান একজন বিতর্কিত ইউপি সদস্য। কার্যক্রমেও তিনি এখনো জুনিয়র। তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দিলে পরিষদ তথা পুরো সাবরাংয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তবে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা নিজেদের আধিপত্য কায়েমের জন্য মান্নানকে দায়িত্ব আনতে চায়।

এ বিষয়ে প্যানেল-৩ এর দায়িত্বরত ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফারিহা ইয়াসমিন জানান, আমাকে অনেক প্রেসার সৃষ্টি করা হয়েছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সেক্রেটারি ও সাবরাং ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব এমপি মহোদয়ের নির্দেশ বলে জোরপূর্বক আমার কাছ থেকে মান্নান মেম্বারের পক্ষে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এভাবে কোনোভাবে একটা ইউনিয়ন চলতে পারে না। আমি বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করেছি।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া আব্দুল মান্নান বলেন, প্যানেল চেয়ারম্যান অটো বাদ হওয়ায় জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমি দায়িত্ব নিয়েছি। আপনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ দায়িত্ব নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি কল কেটে দেন।

এ বিষয়ে টেকনাফ ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, আব্দুল মান্নান নামে একজন ইউপি সদস্যকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটা রিট মামলা ছিল, সেটা স্থগিত করা হয়েছে। কোনো আইনি জটিলতা ছিল না। এ ছাড়া এমপি মহোদয়ের ডিও লেটার ছিল। মাদক মামলার আসামি কীভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবকিছু প্রসিডিওর অনুযায়ী হয়েছে। এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান সিদ্দিকী মন্তব্য করতে রাজি হননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত